খ্রিষ্টান ধর্মগুরুর সঙ্গে বিতর্কে বাংলাদেশী আলেমের বাজিমাত
কোরিয়ায় গতকাল খ্রিষ্টান ধর্মগুরুর সঙ্গে বিতর্কে অংশ নিয়ে বাংলাদেশী আলেম কোরিয়ার আনসান মসজিদের ইমাম ও খতীব, মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান ইসলামকে তুলে ধরে প্রশংসিত হয়েছেন। তিনি কোরআনের স্পষ্ট ভাষ্য তুলে ধরে হাস্যোজ্জ্বল খ্রিষ্টান ধর্মবেত্তার গর্ব ও দর্প মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেন।
গতকাল কোরিয়ায় বাংলাদেশী আলেম সে দেশের আনসান মসজিদের ইমাম ও খতীব, মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান খ্রিষ্টান ধর্মগুরুর সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেন।
মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান বলেন, জীবনে এই প্রথম—একজন পাকিস্তানি খ্রিস্টান ধর্মগুরুর সঙ্গে মুখোমুখি বিতর্কে বসেছি। বুক দুরু দুরু করছিল।
মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান বলেন, সন্ধ্যা তখন ঠিক ছয়টা। আনসান মসজিদ থেকে কফি শপটি বড়জোর পাঁচ মিনিটের পথ। অথচ মনে হচ্ছিল পাঁচ কিলোমিটার দূর। সত্যি বলতে, বাইবেল নিয়ে আমার পড়াশোনা প্রাতিষ্ঠানিক নয়। কিশোর বয়সে নিউ টেস্টামেন্ট পড়েছি, বড় হওয়ার পর পুরো বাইবেল কয়েকবার পড়ার সুযোগ হয়েছে। তবে খ্রিস্টানদের সঙ্গে বিতর্কের জন্য আলাদা কোনো চর্চা কখনো হয়ে ওঠেনি। ইসলামি আইন ও ফতোয়া বিষয়ে যেমন একাডেমিক পড়াশোনা আছে, দাওয়াহ ও আন্তধর্মীয় বিতর্কে তেমন প্রস্তুতি নেই। তবু আল্লাহর সাহায্য ও ভরসা নিয়ে বের হলাম। সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানি মুসল্লি ওয়াকার ভাই।
এক মাস আগেই পাকিস্তানি ধর্মগুরু শমশাদ মাসিহির সঙ্গে আমাদের ইসলামিক সেন্টারে বসার কথা ছিল। “আজ আসব, কাল আসব”—এই করতে করতে বেশ দেরি। শেষে তিনি জানালেন, ইসলামিক সেন্টার বা গির্জা নয়, মাঝামাঝি কোনো নিরপেক্ষ জায়গায় বসবেন। ঠিক হলো—মেগা কফি শপ।
কী হয়েছে, পুরো আলোচনা শুনুন মুফতী ফয়জুল্লাহ আমানের মুখেই—
সন্ধ্যা ছয়টা থেকে সাতটা—টানা এক ঘণ্টার আলোচনা। আমি শুরুতেই তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলাম। তিনি একসাথে বহু বিষয় তুলছিলেন। সঙ্গে উর্দু বাইবেল ও কুরআন। প্রায় প্রতিটি কথার মাঝখানেই তিনি কখনো বাইবেল, কখনো কুরআন খুলছেন। একটি বিষয়ের উত্তর দিতে না দিতেই তিনি অন্য বিষয়ে চলে যাচ্ছেন। আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই ইসলাম ও ইসলামের নবীর ওপর আক্রমণাত্মক বক্তব্য বাড়ছে।
মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান বলেন, এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে কথা বলা সহজ নয়। তবু আলোচনা চালিয়ে গেলাম।
এক পর্যায়ে ওয়াকার ভাই শান্ত কণ্ঠে বললেন, “আজ যেহেতু প্রথম মজলিস, অন্তত একটি বিষয় শেষ করা হোক। আলোচনার মাঝখানে নতুন বিষয় না আনা ভালো।”
আমি শমশাদ ভাইকে বললাম—
“আপনিই বলুন, কোন বিষয়ে কথা বলা যায়।”
তিনি বললেন—
“সুরা আহকাফের ৯ নম্বর আয়াতে মুহাম্মাদ বলছেন—তিনি কিছুই জানেন না। যিনি নিজেই কিছু জানেন না, তিনি কীভাবে আপনাদের পথ দেখাবেন? তিনি তো উম্মি, নিরক্ষর—uneducated।”
আমি বললাম—
“আয়াতটা খুলে দেখুন।”
তিনি আয়াত বের করলেন। আমি পুরো আয়াতটি পড়লাম-
“বল, আমি কোনো নতুন রাসুল নই। আমি জানি না আমার ও তোমাদের ব্যাপারে কী করা হবে; আমি আমার প্রতি যা ওহি করা হয় কেবল তারই অনুসরণ করি। আর আমি তো এক স্পষ্ট সতর্ককারী।”
আমি বললাম—
“আপনি আয়াতের শুরু ও শেষ অংশ বাদ দিয়ে মাঝখানের ‘আমি জানি না’ কথাটি আলাদা করে কোট করেছেন—এটা কি ন্যায়সংগত? অথচ পুরো আয়াতের বক্তব্য হলো, তিনি নিজ থেকে জানেন না; বরং ওহির মাধ্যমে জানেন। এটি সব নবী-রাসুলের ক্ষেত্রেই সত্য। ইঞ্জিলেও একই কথা বলা হয়েছে।”
কিন্তু তিনি ঘুরেফিরে একই কথায় ফিরে আসছিলেন, তিনি জ্ঞানী নন, নিজেই বলেছেন।
আমি বললাম—
“ধরুন কেউ বলে, ‘আমি সারা জীবন চুরি করিনি।’ এখন যদি ‘নি’ শব্দটি কেটে দিয়ে বলা হয়—‘আমি সারা জীবন চুরি করি’—তাহলে কি সেটা ন্যায়সংগত হবে?”
শুরুতে যিনি বেশ হাসিখুশি ছিলেন, হঠাৎ করেই তার মুখের রঙ বদলে গেল।
ওয়াকার ভাই এতদিন তার সঙ্গে আলোচনায় পরাস্ত হয়েছেন—আজ তিনি বারবার ‘সুবহানাল্লাহ’ বলছিলেন। পুরো সময় তার মুখে এক ধরনের প্রশান্তির আলো ছিল। মুখের হাস্যোজ্জ্বল ভাব লুকিয়ে রাখতে পারছিলেন না। মনে হচ্ছিল, আমার চেয়েও তিনি আজ বেশি খুশি। পাশে কয়েকজন আরবও আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন। তারাও বেশ উৎফুল্ল ছিলেন।
সত্যিই—আজকের এই আলোচনায় আমরা নিজেদের যোগ্যতায় নয়; বরং আল্লাহর রহমতেই বিজয়ী হয়েছি।
আলহামদুলিল্লাহ।
যারা খ্রিস্টধর্ম ও ইসলামের আন্তধর্মীয় আলোচনা ও বিতর্কে আগ্রহী—তাদের জন্য এই অভিজ্ঞতাটি শেয়ার করলাম।
