সৌদি আরবে ১৪ দিন

সৌদি আরবে ১৪ দিন

১৯ জুলাই ২০২৫ রোজ শনিবার।

ফজরের তেলাওয়াত দিয়ে দিন শুরু হল।

শায়খ বান্দার বালিলার মনোমুগ্ধকর তেলাওয়াতে হল।চোখ ভরা ঘুম কিন্তু তার ভরাট কন্ঠের কুরআন শরীফে কি যেন ছিল। 

সূরা হুদের নুহ আঃ সংক্রান্ত আয়াতে যখন নুহ আঃ আপন সন্তানের জন্য সুপারিশ করলেন, উত্তরে আল্লাহ পাক কঠিন ধমক দিলেন যা শুনে শরীরটা আমারও কেঁপে উঠল ভয়ে। 

মুশরিকের জন্য আবার কিসের সুপারিশ যে আল্লাহকে এক বলে স্বীকার ই করে না আবার পেশীশক্তি দেখাতে চায় তাও আবার আল্লাহর আযাবের বিরুদ্ধে! 

ইবাদতের সময় অলসতা নিজেকে নিজে মাঝে মাঝে কুপাতে মন চায়। শয়তান এতো বড় শয়তান যে আল্লাহর ঘরের আঙিনায় না আসলে বুঝা ই যেত না।

"লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ"

বাইতুল্লাহর সফরে "জিয়ারাহ" বহুল আলোচিত শব্দ।

হযরত ইবরাহীম আঃ,ইসমাইল আঃ মহানবী হজরত মুহাম্মদ মুস্তাফা সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সহ অসংখ্য নবী রাসূলদের স্মৃতি বিজড়িত স্থান হচ্ছে পবিত্র মক্কা নগরী। তাই হাজী সাহেবদের গুরুত্বপূর্ণ স্থান সমূহ দর্শন করানোর আরবি শব্দ "জিয়ারাহ"

আজ জিয়ারায় যাচ্ছি অসুস্থতার কারণে সাথী কয়েকজন পিছনে থেকে গেলেন। এ অধ্যায়টা আসলেও দুঃখজনক।সুস্থতা আল্লাহ পাকের যে কত বড় নেআমত তা পবিত্র ভূমিতে আসলে বহুগুণ বুঝে আসে। সাথীরা সব চলে যাচ্ছে আর আপনি হোটেলে অসুস্থতার সাথে লড়ছেন!

এখানে কে কখন হারিয়ে যায় বলা মুশকিল। 

সূর্য ধীরে ধীরে চোখ রাঙাতে শুরু করেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় মক্কার সূর্যটা একটু বেশি নির্দয়। 

 সওর পর্বতের পাদদেশে এসে পৌঁছলাম সঙ্গে সকল ইতিহাস। একসাথে মাথায় এলো।

পাহাড়টা বিশালতায় আকাশ ছাড়িয়ে যাবে মনে হয় কিন্ত  হযরত  আবু বকর রা. এর হিম্মতকে?

না না তা কি করে হয়?

 সিদ্দিকে আকবর রাঃ এর হিম্মত ডিঙিয়ে যাওয়ার হিম্মত কার আছে?

আগের বার ভেবেছিলাম পরের বার এসে একদম চূড়ায় উঠব এখন পরের বার পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে। দেখা যাক আমার হিম্মত কতটুকু সঙ্গ দেয়।

রাস্তার দুপাশে দারুণ দারুণ গাছ লাগিয়েছে সৌদী সরকার। ঝকঝকে তকতকে প্রশস্ত সড়ক।

এককথায় মাশাআল্লাহ। 

সাওর পর্বত থেকে গাড়ি আরাফার দিকে ছুটে চলল।

নিমগাছের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছুঁয়ে  ময়দানে আরাফায় প্রবেশ করলাম আলহামদুলিল্লাহ।

 মসজিদে নামিরার বারান্দায় দু রাকাত নামাজ আদায় করে দোআয় মগ্ন হলাম।

মুসলিম উম্মাহ, মা বাবা সন্তান স্ত্রী আত্মীয় স্বজন পরিচিতজন সবার জন্যই দোআ হল।

 রোদের তীব্রতায় বাহিরে বেশিক্ষণ থাকা হল না। এসিতে আশ্রয় নিলাম। হায়রে ঈমান। 

স্মৃতির পাতায় সাহাবায়ে কেরামের কষ্ট চকচক করছিল। আসলে ইসলামের জন্য ত্যাগ স্বীকার করা সুমহান সাহাবীদের কোন উপমা কোনদিন হয় নাই হবে ও না। 

 হযরত বেলাল, সোহাইব রাঃ সহ অন্যান্য সাহাবিদের   উপর করা অত্যাচার কত ভয়াবহ ছিল তা এখানকার রোদে দাঁড়ালে শতভাগের কিছুটা টের পাওয়া যায়।

আজকে এসির যুগে ইবাদাত করতে আমাদের কত গড়িমসি, টালবাহানা অজুহাত অথচ কষ্টের যুগে সাহাবাদের কাছে ইবাদাত করা ছিল পরম আরাধ্য বিষয়, সুখের সুবাতাস । আহ! কোথায় হারিয়ে গেল সোনালী সেদিন।

আরবের বাস সিস্টেম অসাধারণ। বিশ্বসেরা বাসগুলো এখানে হাজীদের পরিবহনের জন্য নিযুক্ত। 

আরবদের জীবনমান বিশ্বসেরা হলেও প্রযুক্তি, উন্নয়ন, সব অন্যের থেকে ধার করা।

 নিজেদের উন্নতি সুখ অগ্রগতির জন্য  নির্ভর করতে হয় অন্যদের প্রযুক্তির উপর। আমার মনে হল শ্রেষ্ঠ জাতি আরবদের পরাজয়ের যাত্রা এখান থেকেই। 

রোদের সাথে জোরপূর্বক মিতালি গড়ে

যুবক বৃদ্ধ সবাই একসাথে জাবালে রহমতের পাদদেশে দোআ করে পাহাড়ে আরোহন শুরু করলাম।

পাহাড়ে উঠার জন্য সিড়ি তৈরী করা হয়েছে তারপর ও অভ্যাস না থাকায় উপরে উঠতে বেজায় কষ্ট হল।

সুদান,কাজাখস্তান, উজবেক, পাকিস্তান ভারত, তুরস্ক সহ আরো অনেক দেশের ভাইয়েরা উঠেছে।অনেকে মার্কার দিয়ে পাথরে নাম লিখছে যেটা কুসংস্কার। 

চূড়ায় উঠে এখানে নামাজ পড়ছে অনেক নারী পুরুষ যা নিয়ম বহির্ভূত।

কয়েকজনকে নিষেধ করলাম মনে হয় কথা শুনলো।চূড়ায় স্থাপিত একটা স্তম্ভ  ধরে অনেকে চুমু খাচ্ছে কান্নাকাটি করছে,সযত্নে আবেগের প্রকাশ হচ্ছে।

কেউ নুড়ি পাথর নিচ্ছেন পরম যত্নে।

কে শুনে কার কথা, এখানে বয়ান চলে না।

 সবাই নিজের মনমতো আবেগের বশে কাজ করছে।

শীতাতপনিয়ন্ত্রিত গাড়িতে আরাফা থেকে মুজদালিফা যাচ্ছি।

অবশ্য হজ্বের সময় হাজী সাহেবগন কষ্ট করেই হেঁটে যান। আল্লাহর ক্ষমা পেতে সেদিন সবাই ব্যাকুল থাকেন, কেঁদে কেটে বুক ভাসান।

 আমি একদিন সেই কষ্ট ক্লেশের মিছিলে শরীক হতে চাই। ক্ষমার আশায় অবিরত কান্না করতে চাই।

আমার ভাগ্য কি সেদিনের জন্য হাসবে? মনে হয়,কারণ আল্লাহর রহমত থেকে একমাত্র কাফেররা ই নিরাশ হয়।

সুতীব্র বাসনা নিয়ে মুজদালিফায় অবস্থিত মসজিদে মাশআরে হারাম দেখলাম, মুজদালিফা অতিক্রম করলাম তীব্র রোদে গাছের পাতাগুলো আর সতেজ সবিজ দেখাচ্ছে সুবহানাল্লাহ।

তারপর মিনার তাবু অতিক্রম করছি। ইয়া মালিক! কবে যে হজ্ব করতে আসব!দয়া করে ডাক দিও রে মালিজ।

মিনার তাবু সম্প্রতি আরো বাড়ানো হয়েছে। অনিন্দ্য সুন্দর দৃশ্য। নিশ্চয়ই হজ্বের সময় তা আরো নয়নাভিরাম জান্নাতিরূপ ধারণ করে।

মসজিদে খাইফ, জামারাত সহ সবকিছু দেখে আফসোস বেড়েই চলল।

দূর থেকেই বুঝে ফেললাম এটা ঐতিহাসিক জাবালে নূর তথা যেখানে পবিত্র কুরআন শরীফ অবতীর্ণ হয়েছে। 

এই সফরে মনটা নরম হচ্ছে কম।ভয় লাগে অন্তর এত পাসান হল কিভাবে। রাস্তায় ট্রাফিক নেই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে অটো সিস্টেম লাইট

ধীরে ধীরে জান্নাতুল মুআল্লায় তারপর ১২ঃ২০ মিনিটে হোটেলে চলে এলাম।

ক্ষুধায় পেট চো চো করছে। খাবার তৈরী ছিল জলদি খেয়ে জঠরজ্বালা নিবারণ করলাম।

খাওয়া দাওয়া করে, জোহর পড়লাম হোটেলের মসজিদে। সামান্য রেস্ট নিয়ে গোসল করে হোটেলোর মসজিদে প্রথম ওয়াক্তে আসরের নামাজ আদায় করলাম।

এবার ঘর ছাড়তে হবে,বাইতুল্লাহর ছায়ায় কাটিয়ে দিতে হবে মলিন জীর্ণ জীবন।

 যাবার পথে প্রথমে সবাই মিলে

ইসমাইল মামার দাওয়াতে কাচা খেজুর ও আরবের প্রসিদ্ধ গাহওয়া খেলাম। ২৪ ঘন্টা নিরন্তর 

সাদা পোশাকের মিছিল লেগেই আছে।

একসময় আমরাও হারিয়ে গেলাম। ইসমাইল মামা ও আরাফাত সাহেবকে নিয়ে স্বতন্ত্র তাওয়াফ করলাম।

তাওয়াফের মাঝেই 

আমাদের কাফেলার মহিলাদের সাথে সাক্ষাৎ।

চোঠ বোনের হাতে  লালচে কাঁচা খেজুর তুলে দিলাম।

মহিলাদের জন্য  তারপর পানি আনতে গিয়ে ফিরে এলাম, ও মা! সবাই উধাও! মহিলাদের তালাশ করে পেলাম না। আবার তাওয়াফ শুরু করে দিলাম। 

পাঠক! তাওয়াফের মাঝে সূরা তীনের ৪ নম্বর আয়াতের তাফসীর বুঝে আসলো। কি দারুণ তাই না?

আল্লাহ পাক মানুষকে যে কত সুন্দররূপে তৈরী করেছেন তার বিবরণ তিনি দিয়েছেন। 

লক্ষ লক্ষ নারী পুরুষ একসাথে তওয়াফ করছে অথচ আল্লাহর ভয়ে সবাই তটস্থ । 

যার ভুল হচ্ছে সে অনুনয় করে  ক্ষমা চাচ্ছে আর অপর ভাই হাসিমুখে ক্ষমা করে দিচ্ছে আল্লাহু আকবার এবারের সফরে হেরেম শরীফে বাঙালি ভাইদের সাথে কথা হল মোটামুটি। 

গত বছরের চেয়ে এবার খাদেমদের পোশাকআশাকে কিছু পরিবর্তন দেখলামবাদ মাগরিব মুজিবুর রহমান ভাইকে ডান দিকে ও আবু বকর চাচাকে বাম দিকে নিয়ে তাওয়াফ শেষ করলাম।

তাওয়াফের মাঝে ছোট ছোট ফুটফুটে শিশুদের দেখে এক দিকে আল্লাহ পাকের সুনিপুণ সৃষ্টির কথা অপরদিকে আফফান সাওবান উনাইসার কথা মনে হয়।

আরো মনে হয় নিষ্পাপ সেই শিশুদের কথা যারা জন্মগত পৃথিবীর নরক ফিলিস্তিনে জন্ম নিয়েছে। কান্না দুশ্চিন্তা ছাড়া তাদের আর কোন দায়িত্ব নেই। 

ইয়া আল্লাহ! ফিলিস্তিনের উপর রহম করো। আরব শাসকদের বোধ আর স্বজাতির মায়া মমতার বদ্ধ দুয়ার খুলে দাও।

এশার নামাজে সেই পুরনো চমৎকার তেলাওয়াত যিনি মাগরিব পড়িয়েছেন।

 নামাজ শেষ পানি নিয়ে হোটেলে ফিরলাম পেট আর দেহের দায়ে।

পা আর চলে না,শীতাতপনিয়ন্ত্রিত জীবন,সমতল রাস্তা, লাইটে লাইটে দিনের আলো কিন্তু‘ শরীর বড্ড দূর্বল হয়ে আসে কিন্তু  আগের মানুষ কিভাবে কি করেছেন।

হোটেলে আসতে আসতে রাত ১০ঃ২০ খেয়েদেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম তাহাজ্জুদে উঠব এই আশায়।

রাতে খেলাম ভর্তা ভাত চিংড়ি মাছ আর ডাউল খাবার দাবার ভালোই হচ্ছে কোন অভিযোগ নেই কিন্তু ইবাদাত ছাই হচ্ছে।

 একই বক্স কিন্তু  তিন বেলা তিন  পদের খাবার আসে।

দুপুরে গোশত,সবজি, ডাউল। 

রাতে  মাছ, ভাজি,ডাউল 

সকালে খুবজা (রুটি) ও ডাউল/হালুয়া এবং ডিম।

শরীর ফিট তো দুনিয়া হিট।

আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু কুল্লুহু

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ