সৌদি আরবে ১৪ দিন
সৌদি আরবে ১৪ দিন (১ম কিস্তি)
মাওলানা আব্দুল মাজিদ দরিয়াবাদির সফরে হিজায পড়ে আজকের সৌদি মেলানো যায় না।
এসি বাস প্রশস্ত হাইওয়ে সবকিছু মিলিয়ে এলাহি কান্ড।
আফফানের আম্মুর কথা মনে পড়ছে, বেচারি খুব আশায় ছিল আমার সাথে এবারও আসবে কিন্তু অশ্রুর অবারিত বর্ষণ ছাড়া তার আর এ যাত্রায় উপায় কি? আল্লাহর দয়ার কথা বলে স্বান্তনা দিলাম।
মুমিনের একমাত্র ভরসা যে তিনি।
শেষমেশ আমার হাতে কিছু টাকা গুঁজে দিয়ে বলল,চকলেট কিনে বাইতুল্লায় আসা কোন শিশু দেখলেই তাদের হাতে দিবেন তাতে আমার এই দুঃখের কিছুটা লাঘব হবে আমি কিছুটা স্বস্তি পাব। এই উসিলায় যদি মাওলা আবার ডাক দেন।
বিমানবন্দর থেকে আমাদের গোটা কাফেলাকে একটা রুমে ঢুকানো হল। এখানকার দায়িত্বরত লোকটার হাতে বারবার আমাদের ধমক খেতে হচ্ছিল।
পরে মনে হল,ওরা নিয়ম মানতে অভ্যস্ত আর ভাঙতে অভ্যস্ত যে জন্য ব্যাটে বলে ঠিকমতো টাইমিং হচ্ছে না।
মুআল্লিমরা এখান থেকে সিমকার্ড কিনলেন।
সালাম, এসটিসি,ঝেইন তিনটি কোম্পানির সিম পাওয়া যাচ্ছে।
১৪ দিনের মেয়াদে সর্বনিম্ন অফার ৪৫ মিনিট ও চার জিবি ইন্টারনেট।
চিন্তা করলাম, আমি অত গুরত্বপূর্ণ কেউ না যে সিম নেওয়া লাগবে তারচেয়ে বড় কথা হল,এই বিদেশের মাটিতে ৩৫ রিয়াল মানে বারোশো টাকার উপরে সুতরাং সতর্ক থাকলাম।
নুসুক জ্যাকেট পরে অনেক তরুণ এখানে দায়িত্ব পালন করছে।
বাস দেখিয়ে দেওয়া,বাসে উঠার আগে ভিসা পাসপোর্ট চেক করা ইত্যাদি ওদের কাজ।
এরা সাধারণত কলেজে পড়ে পাশাপাশি পার্টটাইম এই চাকরি গুলো করে।
ঐ রকমের দায়িত্বে থাকা ছেলেটা আমাদের বাসের পয়েন্ট দেখিয়ে দিল আর "লাইন লাইন" বলে ৪৬ জনকে এক সাথে থাকার উপর জোর দিয়েছিল।
ওদের কথাবার্তায় আমাদের হাজী সাহেবরা হয়তো তাকিয়ে থাকে নয়তো হেসে কুটকুট।
আমাদের ট্রান্সপোর্ট হচ্ছে শিরকাতু আব্দুর রাজ্জাক আল কুতবি।
জেদ্দা টু মক্কা, মক্কা টু মদীনা, মদীনা টু এয়ারপোর্ট, জিয়ারত সবকিছু একই কোম্পানির বাসে হবে।
বাস সব শীতাতপনিয়ন্ত্রিত উন্নত লেভেলের।
বিশ্বসেরা সব সুবিধা একেকটা বাসে ফিট করা।
যত্রতত্র পার্কিং করলে জরিমানা প্রত্যেককে নির্দিষ্ট স্টপেজেই থামতে হবে।
আমাদের অনেকের কাছে এসব নিয়মকানুন উটকো মনে হচ্ছিল, বাংলাদেশই তো ভালো। কোন নিয়মকানুন নেই যার যেভাবে মন চায় চলো।
এখানকার সব গাড়ির গতি নির্দিষ্ট বেশী হলেই জরিমানা।
বাসের যাত্রী সংখ্যা ও নির্ধারিত হাজ্বীদের বাইরে যদি কেউ উঠে হোক সে হাজ্বীদের পরিচিত বা আত্মীয় তাহলে তার জন্য আলাদা ভাড়া গুণতে হবে।
বাস ছাড়ার আগে সবার ভিসা নিয়ে বাস কোম্পানির হেডকোয়ার্টারে পাঠাবে সেখান থেকে ভেরিফাই হয়ে ড্রাইভারের কাছে আসলে তারপর বাস চলা শুরু করবে।
আমাদের বাস চালক পাকিস্তানের পেশাওয়ারের বাসিন্দা সালিম ভাই বেশদক্ষতার সাথে বাস চালান।
পাশের সীটে বসে অবলীলায় উর্দুতে কথা চলল।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী
ইমরান খানের কট্টর সাপোর্টার। বর্তমান পাকিস্তানের সেনাপ্রধানের ঘোর বিরোধীএবং তাঁকে উলামা বিদ্বেষী ট্যাগ দিলেন।
চালক ভদ্রলোক যে কোন মূল্যে ইমরান খানকে ক্ষমতায় চান,সারা দুনিয়ার মুসলমানদের লিডার মনে করেন।
গাড়িতে দারুণ মাইক সেট লাগানো। যাত্রীদের উদ্দেশ্যে একেককরে আমি, মুফতি রঈস, হাফেজ ইয়াকুব সাহেব মক্কা শরীফের ইতিহাস, আমাদের চালচলন কেমন হবে আমলের গুরুত্ব, অপর ভাই বোনদের খেদমতের লাভ ইত্যাদি আলোচনা করলেন।
কিং আব্দুল আজিজ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে থেকে মক্কা শরীফ ৭৩ কিলোমিটার দূরত্বের।
ঘন্টা খানেকের ভিতর এ পথ পাড়ি দিয়ে ফেললাম স্বপ্নের ঘোরে।
দূর থেকে ঘড়ি টাওয়ার দেখা যাচ্ছে। হৃদয়ের স্পন্দন এখনই শুরম্ন হয়ে গেছে।
রাতের মক্কা শরীফ দিনের থেকেও মনে হয় বেশি ফকফকা চোখ ধাঁধানো লাইটিং, সাজ সজ্জা আধুনিক রম্নচিশীল বিল্ডিং পরিচ্ছন্ন রোড-ঘাট সবকিছু অন্য রকম ভালোলাগার মতো।
হুদুদে হারামে গাড়ি প্রবেশ করল।
লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরিত গোটা কাফেলা। বাস একসময়
মিসফালা থেকে বরাবর উপরে উঠে গেল।
একদম বিশাল হোটেলের পাদদেশে।
বাহিরে ডিউটিরত দুইজন মুআল্লিমের নাম জিজ্ঞেস করে চিনে ফেলল এটাই কাঙ্ক্ষিত গাড়ি। সবাইকে মুবারকবাদ জানাল, মুআল্লিমদের আলিঙ্গন করল। হোটেল রুমের আধুনিক কার্ড সিস্টেম চাবি বুঝিয়ে দিল।
দুই মুআল্লিমের সাথী ৪৬ জন হওয়ায় হাফেজ ইয়াকুব সাহেব তাঁর ১৯ যাত্রীকে নিয়ে " ফুনদুক সাইফ আল মাজদ" এর র ৬ষ্ঠ তলায় উঠার সিদ্ধান্ত নিলেন
আর মুফতি রঈস উঠলেন পাহাড়ের উপর অবস্থিত অপরটায়।
এই রোডের নাম হিজরা মুনশিয়া।
হাজীদের রুম বুঝিয়ে দিতে দিতে রাত দুইটা বেজে গেল।
মেজ ভাই ও আমি খাবার সন্ধানে রঈস ভাইয়ের হোটেলে গেলাম।
অনেক তালাশ করে দেখি আমাদের খাবার অন্য আরেকদল হাজ্বী সাহেবরা খেয়ে ফেলেছেন।
এ নিয়ে দুই দলের মধ্যে বেশ কতক্ষণ বিতন্ডা হল।
রিজিকে না থাকলে যা হয়।
হাজী সাহেবদের কোনমতে বুঝ দিয়ে রাখলাম। তাছাড়া বিমানে যথেষ্ট ভালো খাবার হওয়ায় তাদের অসন্তোষ থেকে এ যাত্রায় বাঁচা গেল।
সবাই যেহেতু ইহরাম পরা তাই সতর্ক করে দিলাম যেন দম দিতে না হয়। কোন কোন কারণে দম দিতে হয় তা ও বুঝিয়ে দিলাম।
হাজত সেরে সবকিছু গোছগাছ করে হাজ্বীদের নিয়ে বাইতুল্লাহর উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম।

0 মন্তব্য রয়েছে