প্রচলিত আযান বনাম দাওয়াতুল হক্বের আযান: হাদীসের আলোকে নির্মোহ বিশ্লেষণ।

নবী ও সাহাবী যুগে এবং এরপরে হাজার বছর ধরে দুনিয়াতে মাইক ছিলোনা। তাই মসজিদের মিনারে বা উচু জায়গায় উঠে মুয়াজ্জিন অত্যন্ত উচু আওয়াজে আযান দিতেন, যাতে অনেক দূর পর্যন্ত মানুষ আযান শুনতে পারে।

হাদীসে এসেছে , রাসূলের মুয়াজ্জিন مد بها صوته অর্থাৎ উচু আওয়াজে লম্বা করে আযান দিয়েছেন। কারন আওয়াজ উচু করতে চাইলে টান দিতেই হবে। শব্দের স্বাভাবিক উচ্চারণ ও টান তখন যথেষ্ট নয়; বরং স্বাভাবিকের চেয়ে দীর্ঘ টান জরুরী। যেমন, কাউকে যদি বলা হয়, দূরে দাড়িয়ে থাকা রশীদ নামক ব্যক্তিকে নাম ধরে ডাক দাও। তাহলে যে ডাকবে, সে অবশ্যই অনেক উচু আওয়াজে ডাকবে এবং তখন "রশীইইইইইইদ" বলে লম্বা টান দেয়া ছাড়া তার কোন উপায় থাকবেনা। এটা আল্লাহর তৈরী প্রাকৃতিক পদ্ধতি। এর বিপরীত করা অসম্ভব। তাই দাওয়াতুল হক্বের শর্টকাট আযান, মানুষের স্বাভাবিক উচ্চারণ পদ্ধতি সাহাবাযুগ সহ গত দেড় হাজার বছরের মুসলমানদের আযানের সর্বস্বীকৃত লিগেসির সাথে সাংঘর্ষিক, তা বলাই বাহুল্য। তাদের শেখানো পদ্ধতিতে আযান দিতে গেলে আযানের আওয়াজ উচু করা ও দূরে পৌছানো একেবারেই অসম্ভব।

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর সমস্ত জনপদের শিক্ষিত, অশিক্ষিত, সাদা, কালো, মাযহাবী, লা মাযহাবী, সুন্নি, ইবাদী সমস্ত ধরনের মুসলমানরাই কন্ঠস্বর টেনে দীর্ঘ করে আযান দেয়। যা তারা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শিখেছে। এটাই তাওয়াতুরে আমল। যা শরীয়তের অকাট্য দলীল। এরপরেও উম্মতের সর্বসম্মত আমলের বিপরীতে দাওয়াতুল হক্বের আবিস্কৃত সংক্ষিপ্ত ও খাটো আযানকে কেউ ডিফেন্ড করতে গিয়ে যদি বলে, 'হাজার বছর ধরে দুনিয়ার সব মুসলমান বেদাতী আযান দিচ্ছে' তাহলে তার সাথে আলোচনা করাই নিরর্থক।

এ বিষয়ে আমাদের উস্তায, শাইখুল হাদিস আল্লামা সাঈদ আহমদ পালনপুরী রহ. এর ফতওয়া প্রানিধানযোগ্য।

দারুল উলুম দেওবন্দে তিনি সুনানের তিরমিজির আযানের অধ্যায় পড়ানোর সময় باب ما جاء في الترسل في الأذان 'টেনে আযান দেয়া সংক্রান্ত হাদীস' এই অনুচ্ছেদে আসার পর বলেন, "আমাদের হারদুঈ হযরত যে আজানের আন্দোলন শুরু করেছিলেন, সেটা ভুল ও সুন্নাহ বিরোধী। তিনি দারুল উলুম দেওবন্দের মজলিসে শুরার সদস্য ছিলেন; কিন্তু দারুল উলুমে তাঁর আবিস্কৃত খাটো আজান দেওয়া হয় না বলে তিনি দেওবন্দেও আসতেন না।"

এরপর তিনি বলেন, "একদিন মিরাঠে একটি মাদরাসার মাহফিলে আমার সাথে হারদুঈ হযরতের সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমাকে বললেন, তুমি কেন আমার আজানের আন্দোলনে শরিক হচ্ছো না? আমি বিনয়ের সাথে বললাম, হযরত, আপনার আজান তো খেলাফে সুন্নাত। বললেন দলিল কী? তখন তিরমিজি শরীফ থেকে আমি এই অধ্যায়ের হাদিস পেশ করলাম। এবং দেওবন্দে ফেরার পর আমার ছোটো ভাই মুফতি আমীন পালনপুরী রচিত "আদাবে আজান ওয়া ইকামাত" বইটি হযরতের ঠিকানায় পাঠালাম। এরপর দীর্ঘদিন গত হয়েছে এবং হযরতের ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছে, তবে আজ পর্যন্ত কোন জবাব আসেনি"।

পালনপুরী রহ. বলেন, "এই আযানের বিষয়টা হারদুঈ হযরতের একান্ত নিজস্ব ও বিচ্ছিন্ন চিন্তার অন্তর্ভুক্ত।"

উপরোক্ত আলোচনা থেকে এ কথা স্পষ্ট যে, টেনে আযান দেয়াই সুন্নাহ এবং এর বিপরীত পদ্ধতিকে সুন্নাহ সাব্যস্ত করার চেষ্টা বিদআত।

অথচ দুঃখজনকভাবে দাওয়াতুল হক্বের ভাইরা নিজেদের সিলসিলার এই নবাবিস্কৃত শর্টকাট খেলাফে সুন্নাত আযানকে উম্মতের সামনে সুন্নাহ হিসেবে পেশ করছে বহু বছর ধরে। আল্লাহ তায়ালা তাদের এই অনাকাঙ্খিত বিচ্যুতিকে ক্ষমা করুন।

উল্লেখ্য, আদবের দোহাই দিয়ে এ ধরণের বিকৃতি বা বিচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেয়া ইসলামের সাথে খেয়ানত। আল্লাহ আমাদের সবাইকে খেয়ানত থেকে হেফাজত করুন।

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ