ছবি: সংগৃহীত

জন্মের পর প্রথম কানে বেজেছে "আল্লাহু আকবার - আল্লাহ মহান"। তারপর প্রতিদিন আজানের ধ্বনি শুনে একটু একটু বেড়ে ওঠা। যখন হাঁটতে পারি, তখন থেকেই মক্তবে যাতায়াত। জীবনের প্রথম পাঠ—পড় তোমার প্রভুর নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর থেকে সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে অবিরত ছুটে চলা।

​যৌবনের মধ্যাহ্নে দাঁড়িয়ে বারবার মনে পড়ে মহান রবের অমোঘ বাণী—"সুতরাং তুমি তোমার রবের কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?" তাই তো! জীবনে তিনি কোনো অভাব রাখেননি—সুস্থতা, জ্ঞান, পরিবার-পরিজন, সম্মান, দায়িত্ব, অভাবমোচন—সুবহানাল্লাহ। এভাবে কোথায় ছিলাম আর কোথায় এলাম, তা ভেবে আমি আমার প্রভুভক্ত না হয়ে পারি না।

​তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন পরিপূর্ণভাবে তাঁর অনুগত হতে। মাটির ওপর, মৃত্যুর পরে মাটির নিচে এবং কেয়ামতে; হাশরে, মিজানে, পুলসিরাতে তিনি পার করে দেবেন—যেভাবে দুনিয়ার জীবনে পার করে নিচ্ছেন। আমার রব কখনো অবিচার করেন না, অসত্য বলেন না। আমি ছুটে চললাম নিশ্চিন্তে, পরম শান্তিতে।

​মানুষ হিসেবে প্রচুর ভুল হয়, গুনাহে জড়িয়ে যাই; তবে আবার ফিরে আসার প্রাণান্তকর লড়াই চালিয়ে যাই। এভাবে জগতে আমাকে টিকে থাকতে হয় একজন নিখাদ প্রভুভক্ত ও আত্মিক দ্বীনদার মানুষ হিসেবে। বিপদে বা ব্যথায়, অভাবে-অসুখে বারবার যাকে পাশে পেয়েছি, তিনি আমার আল্লাহ। যে স্লোগান আমাকে এক টুকরো প্রশান্তি দেয়—"লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ"। পবিত্র কুরআন পাঠে হৃদয়ে শীতলতা অনুভব করি, প্রিয় নবীজী (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শ আমাকে বারবার পথ দেখায়, আলেম-উলামাদের সান্নিধ্যে মন জুড়ায়। তাহলে আমার এই দ্বীনমুখী না হয়ে উপায় কী?

​আপনার চোখে আমার এই ভক্তিকে প্রথাবিরোধী বা বাড়াবাড়ি মনে হতে পারে; কিন্তু মাকে ভুলে যাওয়া কি আদর্শ সন্তানের পরিচয়? আমার মাকে আমি 'মা' বলে ডেকে শান্তি পাই, তাঁর চরণতলে জান্নাত খুঁজে বেড়াই। যদি মায়ের দোষ ধরি, মানুষের দ্বারে দ্বারে মায়ের কুৎসা রটাই, তবে জান্নাত খুঁজব কোথায়?

​মৃত্যু একদিন স্বাদহীন মাটির নিচে আমাদের সমাহিত করবে। একাকিত্ব নিঃসঙ্গ জীবনে আমার প্রয়োজন প্রকৃত সাহায্য, স্বস্তি ও সঙ্গী। বিচ্ছেদের সেই দিনে জগতের সব সম্পর্ক, সম্পদ, পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব থেকে বিচ্ছেদ ঘটবে। ভয়াল সেই পরিবেশে আমার প্রয়োজন কেবল এক টুকরো কালিমা আর ৩টি প্রশ্নের সঠিক উত্তর—

​আমার রব কে?

​আমার নবী কে?

​আমার ধর্ম কি?

​আচ্ছা, বলুন তো—এই চিরন্তন মুক্তির পথ ছেড়ে দুনিয়াবী মোহে বিভোর হয়ে থাকার কি কোনো অর্থ আছে?

​পক্ষান্তরে, রাজনৈতিক বা দুনিয়াবী অন্ধত্বের মোহ নিয়ে ভাবুন:

​এই যে মানুষ নিজেদের অন্ধ দলান্ধতায় ডুবিয়ে রাখে, তা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? আপনি কি আপনার দলীয় গণ্ডির জন্য নিঃশর্ত জীবন দিতে চান? আমৃত্যু লড়াই করার শপথ নেন, সকাল-বিকেল দলীয় স্লোগানে আত্মিক শান্তি ও তৃপ্তি খোঁজেন? নেতা-নেত্রীর জন্য নিজের জান-মাল, মান-সম্মান সব বিসর্জন দেন। অথচ এই দল বা নেতা-নেত্রী আপনার বিনিময়ে আপনাকে কী দিয়েছে?

​মৃত্যুর দিনে বা মহা সংকটকালে তারা কি আপনার পাশে থাকবে? কবরের প্রশ্নোত্তরে, হাশরের কঠিন দিনে, ওজনের পাল্লায় কিংবা পুলসিরাত পার হওয়ার সময় কে সাহায্য করবে?

​প্রশ্নগুলো হয়তো অনেকের কাছে অলীক মনে হতে পারে। তবে একজন আশরাফুল মাখলুকাত বা বুদ্ধিমান সৃষ্টি হিসেবে ভেবেচিন্তে কাজ করা উচিত। জীবনটা কোনো ক্ষণস্থায়ী নেতা বা দলের দেওয়া নয়, বরং মহান আল্লাহর আমানত। হিসাবের দিন আসার আগেই আত্মসমালোচনায় বসুন। ক্ষণস্থায়ী দলান্ধতা পরিহার করে চিরন্তন সত্যের পথে অবিচল হোন।

মুহাম্মাদ আইয়ুব

লেখক,গবেষক,মাদ্রাসা পরিচালক

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ