আহমদ সিরাজী। ফাইল ছবি

বাবা হওয়া পৃথিবীর অন্যতম বড় একটি নিয়ামত। যার সন্তান নেই, কেবল তিনিই বোঝেন বাবা হওয়ার প্রকৃত মর্ম। কিন্তু সন্তান হওয়ার পর সবচেয়ে বড় যাতনার বিষয় হলো—জীবনের শেষ বা বৃদ্ধ বয়সে এসে সেই সন্তানের অবহেলার শিকার হওয়া। দুর্বল বয়সে সন্তানই হয় বাবা-মায়ের একমাত্র ভরসার জায়গা। অথচ আজ সমাজে দেখা যায়, অনেক সন্তানই বৃদ্ধ বাবা-মাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে বা ঘরছাড়া করতে উঠেপড়ে লাগে।

জাগতিক শিক্ষার মোহ বনাম ধর্মীয় মূল্যবোধ

দুনিয়াবি শিক্ষায় শিক্ষিত করে সন্তানকে ছোটবেলা থেকে আমরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে আগলে রাখি। গাড়ি, বাড়ি, কাজের লোক—কোনো দিক থেকেই অভাব রাখি না। পক্ষান্তরে, অনেক অভাব-অনটনের ঘরে বেড়ে ওঠা সন্তানও আল্লাহর ভয়ে এবং ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের কারণে শেষ বয়সে বাবা-মাকে রাজা-রানীর মতো মাথায় তুলে রাখে। কিন্তু ছোটবেলা থেকে দুনিয়ার চাকচিক্য দিয়ে যাকে বড় করা হলো, সে আজ বাবা-মাকে সহ্য করা তো দূরের কথা, বরং তাদের মৃত্যুর প্রহর গোনে! এর থেকে উত্তরণের উপায় কী?

বিশ্বাসের ভিত্তি ও সঠিক শিক্ষার অভাব

পৃথিবীতে একটি বিষয় সর্বজনস্বীকৃত যে, মানুষকে তার বিশ্বাস দিয়ে সবচেয়ে ভালোভাবে বেঁধে রাখা যায়। মানুষ যে ধর্মেরই হোক না কেন, যদি তার মধ্যে সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ণ আস্থা এবং পরকালের ভয় থাকে, তবে সে তার দায়িত্ববোধ সম্পর্কে সচেতন হবে। সৃষ্টিকর্তাই তার অন্তরে বাবা-মায়ের প্রতি ভালোবাসা, গুরুত্ব এবং তাদের দোয়ার প্রতি আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে দেন।

কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আমরা সন্তানের জীবনের সবকিছুতে ফোকাস করলেও, ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে তাদের একদম বেমালুম এড়িয়ে যাই। ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা যদি ভেতরে না থাকে, তবে সে বড়দের সম্মান করা, ছোটদের স্নেহ করা এবং বাবা-মায়ের প্রতি কর্তব্য পালন থেকে উদাসীনই থেকে যাবে।

প্র্যাকটিক্যাল বা বাস্তব শিক্ষা

সন্তান যখন ছোট থাকে, তখন সে ঠিক কাদামাটির মতো। তার মস্তিষ্ককে যেভাবে রূপ দেওয়া হবে, সে সেভাবেই বেড়ে উঠবে। যে সময়টা সে আপনার অধীনস্থ ও আপনার ওপর নির্ভরশীল, সেটাই তাকে ধর্মীয় ও নৈতিক জ্ঞানে দীক্ষিত করার সুবর্ণ সুযোগ।

সন্তানের শিক্ষা মূলত দুইভাবে হয়—প্রথমত পুঁথিগত শিক্ষা এবং দ্বিতীয়ত প্র্যাকটিক্যাল বা বাস্তব শিক্ষা। সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে এই প্র্যাকটিক্যাল শিক্ষাই। আপনি যখন আপনার বৃদ্ধ বাবা-মাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন এবং তাদের বোঝা মনে করবেন, আপনার সন্তানও ঠিক সেই শিক্ষাই পাবে। আপনি বাস্তবে আপনার মুরুব্বিদের সম্মান না করলে, তাদের প্রতি অবিচার করলে, আপনার সন্তান ছোটবেলা থেকেই সেই মানসিকতা নিয়ে বড় হবে। আপনি আপনার বাবা-মায়ের সাথে যে আচরণ করছেন, ভবিষ্যতে আপনার সন্তানের কাছ থেকে ঠিক সেই আচরণ পাওয়ার জন্যই প্রস্তুত থাকুন। এর ব্যতিক্রম কোনো সুফল আপনি আশা করতে পারেন না।

প্রজন্মের মেলবন্ধন ও পারিবারিক বরকত

বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাবা-মায়ের সাথে আপনার চিন্তা-চেতনার অমিল হতেই পারে। তাই বলে তাদের খাওয়ানো, পরানো বা ঘরে রাখাকে ‘বোঝা’ মনে করাটা কেমন কথা? বরং, যে ঘরে বৃদ্ধ বাবা-মা থাকেন, সে ঘরে মহান আল্লাহর রিজিক ও বরকত ভরপুর থাকে।

পরিস্থিতি তো এমন হওয়া উচিত যে, বাবা-মায়ের সেবা করার জন্য সন্তানদের মাঝে প্রতিযোগিতা লেগে যাবে। কিন্তু আক্ষেপের বিষয়, শেষ বয়সে বাবা-মাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতাই এখন সমাজে বেশি চোখে পড়ে!

আপনি আপনার বাবা-মাকে অবহেলা করে কী ক্ষতি করছেন, তা কি কখনো কল্পনা করেছেন? আপনি তাদের খাওয়ান বা না খাওয়ান, তাদের দিন ঠিকই কেটে যাবে। কিন্তু এর মাধ্যমে আপনি আপনার মনের শান্তি এবং আপনার সন্তানদের তাদের দাদা-দাদির প্রতি শ্রদ্ধা থেকে বঞ্চিত করছেন। দাদা-দাদি ও নাতি-নাতনির খুনসুটি পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর একটি দৃশ্য। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের কপালে চুমু খাওয়া পৃথিবীর পরম শান্তির একটি কাজ। এসব থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে দূরে রাখা শুধু ধর্মীয় মূল্যবোধের অবক্ষয়ই নয়, বরং চরম নির্বুদ্ধিতারও প্রকাশ।

আহমদ সিরাজী

মুহাদ্দিস, জামিয়া নূরে মদিনা, মালিবাগ, ঢাকা।

সিইও, ব্রিং ফোর্থ গ্লোবাল ও স্বাধীনতার বার্তা।

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ