আহমদ সিরাজী।ফাইল ছবি

ধান গাছে ধান হয়, আম গাছে আম হয়, আর কাঁঠাল গাছে কাঁঠাল। কেউ যদি প্রশ্ন করে কাঁঠাল গাছে কেন কাঁঠাল ধরছে না, তবে তা যৌক্তিক। কিন্তু কাঁঠাল গাছে কেন আম হয় না—এমন প্রশ্ন তুললে তাকে অসুস্থ বা বিকৃত মস্তিষ্কের মানুষ হিসেবেই ধরে নেওয়া হবে।

প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই একটি নিজস্ব পরিমণ্ডল থাকে, থাকে নিজস্ব উদ্দেশ্য ও স্বকীয়তা। কথা না পেঁচিয়ে সরাসরি যদি বলি, মাদরাসার উদ্দেশ্য ও স্বকীয়তা সম্পর্কে কে না জানে? একজন অভিভাবক তার সন্তানকে মাদরাসায় ডাক্তার বা পাইলট বানানোর জন্য পাঠান না। তাঁরা ভালো করেই জানেন, এখানে পড়াশোনা করলে সন্তান আলেম হবে, মুফতি হবে, হাফেজে কোরআন হবে।

মাদরাসা: আলোকিত মানুষ গড়ার কারখানা

মাদরাসায় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে (সা.) চেনানো হয়। মা-বাবার প্রতি কর্তব্য, মুরুব্বিদের শ্রদ্ধা, ছোটদের স্নেহ করা শেখানো হয়।

এখান থেকে যুগের ফকিহ তৈরি হয়। হাদিসজ্ঞ বের হয়।

সমাজের হানাহানি দূর করে কীভাবে শান্তি ফিরিয়ে আনা যায়, উম্মতকে কীভাবে জান্নাতমুখী করা যায়, পরকালের চিন্তায় কীভাবে মানুষকে প্রস্তুত করা যায় এবং সর্বোপরি একজন মানুষকে কীভাবে সত্যিকারের ‘মানুষ’ হিসেবে গড়ে তোলা যায়—এসব বিষয়ই এখানে শিক্ষা দেওয়া হয়।

সুস্থ সমাজ বিনির্মাণে সত্যিকারের মানুষ তৈরির এক অনন্য কারখানা হলো মাদরাসা। এখানে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম শিক্ষা দেওয়া হয়, দেওয়া হয় কুরআন ও সুন্নাহর দরস। এখানেই সেই শিক্ষা দেওয়া হয়, যেন শিক্ষার্থীরা দেশ ও জাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের কওমি মাদরাসাগুলো এক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে। আজকাল অনেক স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, এমনকি আলিয়া মাদরাসার শিক্ষকরাও তাঁদের সন্তানকে কওমি মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। কারণ তাঁরা জানেন, এখান থেকেই যোগ্য আলেম তৈরি হচ্ছে। এ বাংলার প্রতিটি ঘর আজও কওমি মাদরাসার আলেমদের অবদানে শান্তির আলোয় ঝলমল করছে। সমাজের যেকোনো বিপদে আলেমদের ভূমিকা সত্যিই অনস্বীকার্য। মসজিদের মিম্বর থেকে শুরু করে তাবলিগের বয়ান কিংবা মুফতি সাহেবের কলমের লেখনী—সর্বস্তরে শান্তির যে আহ্বান আজও বিরাজমান, তা আমাদের আলেম-উলামাদেরই ফসল।

স্বনির্ভর ও স্বকীয়তায় উজ্জ্বল এদেশের আলেম সমাজ

আজকে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টরেই বাইরের দেশের মুখাপেক্ষী হতে হয়। ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে শুরু করে টেকনোলজি—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশকে এখনো অন্যদের অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশের আলেম-উলামাদেরকে বাইরের দেশের আলেমদের মুখাপেক্ষী হতে হয় না। ইলমি (জ্ঞানের) বিষয়ে বাংলাদেশের কোরআনের হাফেজ থেকে শুরু করে ইসলামিক আইন—প্রতিটি সেক্টরে রয়েছে নিজস্ব স্বকীয়তা ও শ্রেষ্ঠত্ব।

বাইরের দেশের উলামায়ে কেরামও একথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে। এদেশের মাটিতে শুয়ে আছেন বহু জগৎবিখ্যাত ফকিহ। এদেশের মাটি অনেক উর্বর, এখানে আজও সত্যিকারের আলেম তৈরি হচ্ছে। এদেশের কোরআনের হাফেজরা সারা বিশ্ব জয় করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিচ্ছেন। এদেশের মাটিতেই জন্ম নিচ্ছেন কিংবদন্তি মহানায়করা।

বালখিল্যপনা ও বিদ্বেষের জবাব

সুতরাং, ‘কওমি মাদরাসায় কেন ডাক্তার তৈরি হয় না’—এ ধরনের অবান্তর প্রশ্ন তোলার আগে প্রশ্নকারীদের নিজেদেরই মানসিক চিকিৎসা করানো উচিত। বিশেষ করে নির্দিষ্ট একদলের মানুষ এই কথা বেশি আওড়ান। আমি জানতে চাই, কোনো রাজনৈতিক দল কি ব্যারিস্টার তৈরি করে? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল-মোক্তার—এগুলো কি কোনো রাজনৈতিক দল তৈরির কারখানা?

আজও বাংলার ঘরে ঘরে এমন অনেক ইঞ্জিনিয়ার এবং ডাক্তার পাবেন, যারা কোরআনের হাফেজ; যাদের শিক্ষার হাতেখড়ি হয়েছে বাংলার কওমি মাদরাসার আলেমদের কাছেই। আমাদের সন্তানদের আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতেই আমরা আলেম-উলামাদের সান্নিধ্যে পাঠাই। আর ডাক্তার বানাতে চাইলে আমরা মেডিকেল কলেজগুলোতে ভর্তি করাই, ইঞ্জিনিয়ার বানাতে ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটিতে পড়াই।

মেডিকেল কলেজের কাজ ডাক্তার বানানো, আর ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোর কাজ ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করা। যদি কোনো মেডিকেল কলেজ যোগ্য ডাক্তার বানাতে ব্যর্থ হয়, তখন সেখানে প্রশ্ন তোলা যৌক্তিক যে, কেন ওখান থেকে ভালো ডাক্তার বের হচ্ছে না?

হাজারো ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও ব্যারিস্টারের শিক্ষার হাতেখড়ি এই কওমি আলেমদের কাছেই। সমাজে এমন শিক্ষিত মানুষ খুব কমই পাবেন, যার ওস্তাদ কোনো আলেম নন। বরং প্রতিটি মুসলিম বাবা-মায়ের সন্তানের পড়াশোনার হাতেখড়ি একজন আলেমের হাত দিয়েই শুরু হয়। এই বাংলার প্রতিটি ঘর আজও আলেম-উলামাদের আলোয় আলোকিত।

সেখানে হঠাৎ করে কেউ এসে যদি বলে, কেন মাদরাসাগুলোতে ডাক্তার তৈরি হয় না? এমন প্রশ্ন নিছক বালখিল্যপনা এবং বিদ্বেষ ও হিংসার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া আর কিছুই নয়।

আহমাদ সিরাজী

মুহাদ্দিস, জামিয়া নূরে মদিনা, মালিবাগ, ঢাকা।

সহকারী সম্পাদক, স্বাধীনতার বার্তা

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ