ইসলাম ও কাদিয়ানিজম
ইসলাম ও কাদিয়ানিজম (২য় পর্ব)
আল্লামা ইকবাল
কলকাতার ‘মডার্ন রিভিউ’ পত্রিকায় পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুর তিনটি নিবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর বিভিন্ন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতের মুসলমানদের কাছ থেকে আমি বহু পত্র পেয়েছি। সেসব পত্রে উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর মধ্যে দুটি বিষয় বিশেষভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। প্রথমত, অনেকেই চেয়েছেন—আহমদিয়ত সম্পর্কে ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থান আমি আরও স্পষ্ট, সুসংহত ও নির্ভুলভাবে ব্যাখ্যা করি এবং সেই অবস্থানের ন্যায়সঙ্গত ভিত্তিও তুলে ধরি। দ্বিতীয়ত, কেউ কেউ জানতে চেয়েছেন—এই সমগ্র প্রসঙ্গে আমি কোন মৌলিক প্রশ্নটিকে আসল কেন্দ্রবিন্দু বলে মনে করি।
এই কারণেই আমি বর্তমান আলোচনায় প্রথমেই সে-সব জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে চাই—যে উত্তর দেওয়া আমার বিবেচনায় একান্ত প্রয়োজনীয় এবং ন্যায়সংগত। এরপর আমি পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর দিকে ফিরে তাকাব এবং সেগুলোর উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
তবে শুরুতেই একটি কথা স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন। আমার আলোচনার কিছু অংশ পণ্ডিতজির প্রত্যক্ষ আগ্রহের বিষয় নাও হতে পারে। কারণ এই প্রশ্নের এমন কিছু মাত্রা রয়েছে, যা মূলত মুসলমানদের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসচেতনা, আত্মপরিচয় এবং দীনী মানদণ্ডের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কিত। ফলে তাঁর সময়ের মূল্য বিবেচনা করে আগেভাগেই বলে রাখা সমীচীন—তিনি চাইলে সেই অংশগুলো এড়িয়ে যেতে পারেন। তাতে আমার বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য কোনোভাবেই ব্যাহত হবে না।
এ কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, পণ্ডিতজির এই অনুসন্ধিৎসা ও আগ্রহকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই। বরং আমার দৃষ্টিতে এটি এমন একটি প্রশ্নের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা কেবল ভারতবর্ষের নয়, সমগ্র প্রাচ্যের—এমনকি আধুনিক বিশ্বেরও—অত্যন্ত গভীর, জটিল ও সুদূরপ্রসারী সমস্যাগুলোর একটি। কারণ আহমদিয়তের প্রশ্ন নিছক কোনো সম্প্রদায়গত বিতর্ক নয়; এটি মুসলিম আত্মপরিচয়, নবুওয়তের চূড়ান্ততা, ধর্মীয় সত্যের সীমানা এবং আধুনিকতার চাপে ইসলামি চেতনার প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কোনো প্রান্তিক মতভেদের প্রশ্ন নয়; বরং ইসলামের আত্মস্বরূপ, তার বিশ্বাসগত অখণ্ডতা এবং তার ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা সম্পর্কিত এক মৌলিক বিতর্ক। এ বিতর্কে কেবল একটি বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি বা অবস্থান বিচার্য নয়; বরং বিচার্য হলো—ইসলাম নিজেকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করে, তার বিশ্বাসগত সীমারেখা কোথায় নির্ধারিত হয় এবং পরিবর্তনশীল আধুনিক জগতে সেই সীমারেখা রক্ষার নৈতিক ও বৌদ্ধিক ভিত্তি কতখানি দৃঢ়।
আমার জানা মতে, ভারতীয় জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বের মধ্যে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুই সম্ভবত প্রথম ব্যক্তি, যিনি ইসলামের জগতে চলমান বর্তমান আত্মিক অস্থিরতাকে বুঝতে আন্তরিক আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। আমি তাঁর এই আগ্রহকে কেবল ব্যক্তিগত কৌতূহল বলে মনে করি না; বরং একে আমি বৌদ্ধিক দায়িত্ববোধের পরিচায়ক বলে বিবেচনা করি। কারণ, মুসলিম সমাজে যে আলোড়ন চলছে, তা কোনো একক ঘটনার ফল নয়; এর শিকড় বহু গভীরে প্রোথিত।
এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিশ্বাসের প্রশ্ন, সভ্যতার প্রশ্ন, আধুনিকতার অভিঘাত, রাজনৈতিক পরাধীনতা, আত্মসমালোচনা এবং ধর্মীয় পুনর্গঠনের নানা প্রচেষ্টা। ফলে এই অস্থিরতার রূপ যেমন বহুবিচিত্র, তেমনি তার প্রতিক্রিয়াও বহুমাত্রিক। কোথাও তা আত্মরক্ষার ভাষায় উচ্চারিত হয়েছে, কোথাও আত্মসমালোচনার ভাষায়, কোথাও আবার নতুন ব্যাখ্যার মোহে পুরোনো সত্যের সীমারেখাকে অস্বচ্ছ করে তোলার প্রবণতায়।
ঠিক এ কারণেই আমি মনে করি, ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের চিন্তাশীল অংশ যদি সত্যিই উন্মুক্ত মন নিয়ে বোঝার চেষ্টা করেন—এই মুহূর্তে ইসলামের হৃদয়ভূমিকে কোন সত্য আন্দোলিত করছে, তার প্রকৃত তাৎপর্য কী এবং সেই অস্থিরতার অন্তর্গত নৈতিক ও বৌদ্ধিক প্রশ্নগুলো কোথায় নিহিত—তবে তা নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী, প্রয়োজনীয় এবং সুদূরপ্রসারী হবে।
কারণ কোনো জাতি বা সম্প্রদায়কে কেবল তার রাজনৈতিক স্লোগান, সংগঠন বা তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দিয়ে বোঝা যায় না; তাকে বুঝতে হলে তার গভীরতম বিশ্বাস, তার আঘাত, তার অন্তর্দ্বন্দ্ব, তার ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং তার পুনরুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকেও বুঝতে হয়। মুসলিম সমাজের বর্তমান আলোড়নকে বুঝতে হলে তাই বাহ্যিক ঘটনাপুঞ্জের দিকে তাকালেই চলবে না; তার অন্তর্নিহিত আত্মিক ব্যাকরণও পাঠ করতে হবে। আর কাদিয়ানি-প্রশ্ন সেই অন্তর্গত ব্যাকরণকে বুঝে ওঠার এক গুরুত্বপূর্ণ জানালা।
ভাষান্তর: হাসিবুল হাসান

0 মন্তব্য রয়েছে