তেল সংকট বনাম হাশরের ময়দান

তেল সংকট বনাম হাশরের ময়দান

মুহাম্মাদ আইয়ুব

আজকাল তেলের মাঠ একদম গরম। পকেটে টাকা আছে কিন্তু চাইলেই কিনতে পারবেন না।

অবশ্য যাদের বৈধ লাইসেন্স আছে তারা প্রতিদিন একেক ওভারে ৩৬ করে রান তুলছে। লাইফে মনে হয় একবারই সুযোগ পেয়েছে ব্যাস কামিয়ে নিচ্ছে।

আমার ছোটখাটো একটা বাইক আছে, বাড়ি টু মাদ্রাসা।

মাঝেমাঝে গঞ্জে যেতে হয় মাদ্রাসার কাজে কিন্তু বিরাট তেল সংকট(?)

তেল সংকট বললে অন্যায় হবে কারণ জালানি মন্ত্রী বলছেন দেশে কোন সংকট নেই তাহলে আমরা মাঠপর্যায়ের ভোক্তারা কেন সংকটের মুখে পড়লাম?

ফিলিং স্টেশনে লাইন ছাড়া কোন কারবার নেই,ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা কর, শেষে শূন্য টাংকিতে বাড়ি যাও।

হুজুর হয়ে পড়ছি আরেক ফাফরে,অতিরিক্ত দামে কেউ আমার কাছে তেল বিক্রি করবে না সাধু অথচ বিপদের মুখে আমি অতিরিক্ত দামেই নিব।

২.

যাদের বাইক আছে ঘনঘন এদিক সেদিক যায় তাদের কাছে অনুনয় বিনয় করলাম কিন্তু সবাই বলে একটুখানি আছে আমার লাগবে, দিতে পারব না।

অমুকের কাছে যান।

একজন অপরের কাছে রেফার করে আমিও আশা নিয়ে লাজ শরমের মাথা খেয়ে ঘুরতে থাকি কিন্তু কেউ পাশে দাঁড়ায় না।

শুনছিলাম, মানুষ মানুষের জন্য কিন্তু দিনশেষে কেউ কারো জন্য নয়।

৩.

তেলের কথা ভাবতে ভাবতে আমার হাশরের কথা মনে পড়ে গেল। তেলের বাজার তো ঘুরলাম এবার একটু

​হাশরের ময়দানে ঘুরে আসি।

সেদিন সূর্য মানুষের একেবারে মাথার কাছে চলে আসবে। দীর্ঘ সময় মানুষ এই প্রচণ্ড উত্তাপে দাঁড়িয়ে থাকবে।

​হাদিসে এসেছে,"কিয়ামতের দিন সূর্যকে মানুষের এত কাছে আনা হবে যে, তা মাত্র এক মাইল দূরত্বে থাকবে। মানুষের আমল অনুযায়ী তারা ঘামের মধ্যে ডুবে থাকবে। কেউ গোড়ালি পর্যন্ত, কেউ হাঁটু পর্যন্ত, আর কেউ ঘামের লাগাম দ্বারা আবদ্ধ হবে (অর্থাৎ মুখ পর্যন্ত ঘামে ডুবে থাকবে)।" — সহিহ মুসলিম: ২৮৬৪

​মানুষের মানসিক অবস্থা ও অস্থিরতা

​সেদিন মানুষ এতটাই আতঙ্কিত থাকবে যে, নিজের আপনজনদের কথাও ভুলে যাবে। প্রত্যেকে শুধু নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে।

পবিত্র ​কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন, "সেদিন মানুষ পলায়ন করবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা ও তার বাবার কাছ থেকে এবং তার স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে। সেদিন তাদের প্রত্যেকেরই এমন এক অবস্থা হবে, যা তাকে অন্য সবার দিক থেকে উদাসীন করে দেবে।" — সূরা আবাসা: ৩৪-৩৭

কুরআনে আরো এসেছে, "সেদিন কোনো বন্ধু কোনো বন্ধুর খবর নেবে না, যদিও একে অপরকে দেখতে পাবে।"

"অপরাধী সেদিন চাইবে তার সন্তানদেরকে মুক্তিপণ হিসেবে দিয়ে দিতে, তার স্ত্রী ও তার ভাইকে, তার নিকটাত্মীয়দেরকে যারা তাকে আশ্রয় দিত এবং পৃথিবীর সবাইকে—যাতে সে নিজেকে রক্ষা করতে পারে।"

সূরা আল-মা’আরিজ: (১০-১৪)

হাশরের ময়দানের ভয়াবহতার একটি অন্যতম দিক হলো নেকির জন্য মানুষের হাহাকার।

সেদিন মানুষ এতটাই নিঃস্ব অবস্থায় থাকবে যে, সামান্য একটি নেকির জন্য সে তার সবচেয়ে প্রিয়জনদের কাছেও গিয়ে মিনতি করবে, কিন্তু কেউ কাউকে সাহায্য করতে রাজি হবে না।

এই বিষয়টি পবিত্র কুরআন ও তাফসিরে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে,

" তাফসিরবিদগণ বলেন, সেদিন মানুষ তার আপনজনদের দেখে পলায়ন করবে এই ভয়ে যে—পাছে তারা তার কাছে কোনো নেকি চেয়ে বসে অথবা দুনিয়াতে তাদের কোনো হক নষ্ট করে থাকলে তার দাবি জানিয়ে দেয়।

বন্ধু ও পরিচিতদের আচরণ

সেদিন বন্ধুত্ব বা বংশীয় পরিচয় কোনো কাজে আসবে না। প্রত্যেকেই ইয়া নফসি (আমার কী হবে) করতে থাকবে।

নেকির জন্য আকুতি

বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়, মানুষ যখন দেখবে তার নেকির পাল্লা হালকা হয়ে যাচ্ছে, তখন সে তার বাবা কিংবা সন্তানের কাছে গিয়ে বলবে, "দুনিয়াতে আমি তোমার জন্য কত কষ্ট করেছি, আজ আমার মাত্র একটি নেকির প্রয়োজন, আমাকে কি একটি নেকি দেবে?"

কিন্তু উত্তরে বাবা বা সন্তান বলবে, "আজ আমি নিজেই বিপদে আছি, যে জিনিসের ভয় তুমি করছ, আমিও সেই একই জিনিসের ভয় করছি।"

ফলে কেউ কাউকে এক বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেবে না।

বিনিময় বা মুক্তিপণের আকাঙ্ক্ষা

মানুষ সেদিন এতটাই মরিয়া থাকবে যে, সে চাইবে তার পরিবারের সবাইকে জাহান্নামে দিয়েও যদি সে নিজে মুক্তি পায়।

এসব পড়ে আমি একান্ত মনে কয়েকদিন যাবত ভাবছি,

হাশরের ময়দান তো হবে সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থপরতার জায়গা।

দুনিয়াতে যারা একে অপরের জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত ছিল, তারা সেদিন একে অপরকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নেবে। একমাত্র নেক আমল ছাড়া সেদিন আর কোনো কারেন্সি বা বিনিময় মাধ্যম থাকবে না।

কিন্তু দুনিয়ার বুকে এত তাড়াতাড়ি হাশর নামবে কে জানত?

আল্লাহ আমাদের সেই কঠিন দিনে লজ্জিত হওয়া থেকে রক্ষা করুন।

আমীন।

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ