সমিরনের বিষাদময় বিবাহ

সমিরনের বিষাদময় বিবাহ

মুহাম্মাদ আইয়ুব

এক কান দুকান করে পুরো এলাকায় রাষ্ট্র হয়ে গেল—ফয়জুল সাহেবের মেয়ের বিয়ে আগামীকাল। আনন্দ-আয়োজনের ব্যস্ততার মাঝেই রাত দশটায় হুট করে উদয় হলো এলাকার দুয়েকজন প্রভাবশালী মাতব্বর। ডেকে নিয়ে গেল ফয়জুল সাহেবকে।

"শুনেছি মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন?" তাদের একজনের গলায় জিজ্ঞাসার চেয়ে জেরা বেশি।

ফয়জুল সাহেব বিনয়ের সাথে বললেন, "জি।"

"কিন্তু এটা তো বাল্যবিবাহ!"

"তো?" ফয়জুল সাহেবের গলায় খানিকটা বিস্ময়।

"উপজেলায় খবর চলে গেছে। কাল সকালে পুলিশ এসে প্যান্ডেল উপড়ে ফেলবে, হাজতবাসও হতে পারে।"

ফয়জুল সাহেব সজ্জন ও পরম সম্মানিত মানুষ। জীবনে কোনোদিন থানা-পুলিশের চৌকাঠ মাড়াননি। এসব উটকো ঝামেলায় মান-সম্মান ধুলোয় মিশবে ভেবে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। অসহায় চোখে তিনি এই 'হিতাকাঙ্ক্ষী' শেয়ালদের কাছেই বুদ্ধি চাইলেন—উপায় কী?

মুরগির আশায় ওরা তো ওত পেতেই ছিল। দাঁত বের করে হাসল একজন, "বিশ হাজার টাকা ফেলুন, সব ম্যানেজ করে দেব। আমরা থাকতে আপনার ইজ্জতে হাত দিতে দেব না।"

মধ্যবিত্তের টানাটানির সংসার। নামমাত্র বেতন, বড় পরিবার, কাল মেয়ের বিয়ে। কেনাকাটা আর আয়োজনে পকেটের অবস্থা এমনিতে শোচনীয়। ফয়জুল সাহেব ভাবলেন, বাল্যবিবাহ যদি রাষ্ট্রের আইনে অপরাধ হয়, তবে ঘুষ দেওয়া-নেওয়া তো স্রষ্টার আইনেও মহাপাপ। কিন্তু এই শেয়ালরা স্রষ্টার আইন মানতে নারাজ। তারা যেন এই পৃথিবীতেই অমরত্বের সনদ নিয়ে এসেছে। অসহায় মানুষকে আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে আজীবন এভাবে ঘুষ-বাণিজ্যের আয়েশ করেই তাদের দিন কাটবে।

ফয়জুল সাহেব এক রাত সময় নিলেন।

রাতভর ভাবলেন—কাল বর আসবে, সব প্রস্তুতি শেষ। সামান্য কটা টাকার জন্য কিছু লোভী মানুষের দৌরাত্ম্যে মেয়ের বিয়েটা ভেঙে যাক, সেটা একজন বাবা হিসেবে তিনি মানতে পারলেন না। মান-সম্মান বাঁচাতে শেষমেশ প্রতিবেশীর কাছ থেকে দশ হাজার টাকা ধার করে কাকভোরেই সেই শেয়ালদের মুখে হাড় ছুঁড়ে দিলেন। থেমে গেল তাদের 'হুক্কা হুয়া'।

সরকার আইন করে, আর একদল মানুষ সেই আইনের ভয় দেখিয়ে ফায়দা লোটে। ফয়জুল সাহেবদের এই চাপা আর্তনাদ শোনার কি কেউ নেই?

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ