প্রথম আলোর ‘ধর্মচর্চা’

প্রথম আলোর ‘ধর্মচর্চা’

মুহাম্মাদ আইয়ুব

আমার এ প্রবন্ধের শিরোনাম দেখে আপনার খটকা লাগা স্বাভাবিক, কিন্তু বাস্তবতা যখন বিশ্লেষণ করব তখন প্রথম আলোর একটি অদ্ভুত রূপ সামনে আসবে। আমরা যারা নিয়মিত পত্রিকা পড়ি, তারা জানি প্রথম আলো মূলত নিজেকে একটি প্রগতিশীল ও সেক্যুলার ধারার গণমাধ্যম হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

কিন্তু মজার বিষয় হলো, তাদের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে গেলে মনে হবে এটি কোনো ধর্মীয় প্রচার মাধ্যম! ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ধার্মিকতার হাতছানি প্রথম আলোর অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ঘাটলে দেখা যায় যে,তাদের ‘ধর্ম’ নামে একটি সুনির্দিষ্ট ক্যাটাগরি আছে। সেখানে ইসলাম, সনাতন, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান ধর্মের জন্য আলাদা বিভাগ রয়েছে। বিশেষ করে ইসলাম ধর্ম নিয়ে তাদের নিয়মিত আয়োজনগুলো দেখলে আমার মত যে কেউ বিস্মিত হবেন।

উদাহরণস্বরূপ সাম্প্রতিক কিছু শিরোনাম লক্ষ করা যাক:

* ইবাদত: কোরআনের আয়নায় নামাজের গুরুত্ব ও নির্দেশাবলী। * সুন্নাহ: নবীজি (সা.)-এর প্রিয় আমল তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত। * রমজান: সিয়াম সাধনায় ‘খুশু’ বা একাগ্রতার প্রয়োজনীয়তা। * হাদিস: মানববেশে জিবরাইল (আ.)-এর আগমনের শিক্ষা। * মাসয়ালা: ওজুর দোয়া এবং শয়তানের ‘ওয়াসওয়াসা’ থেকে বাঁচার উপায়। * ইতিহাস: সাকিফ গোত্রের ইসলাম গ্রহণ। এসব পড়ে মনে হতে পারে, দেশের বৃহত্তম এই নিউজ কোম্পানিটি বোধহয় সাধারণ মানুষকে কুরআন-হাদিসের পথে উদ্বুদ্ধ করতে এবং সঠিক ইবাদত শেখাতে ব্রতী হয়েছে।

স্ববিরোধী সম্পাদকীয় নীতি

সমস্যাটা বাধে তখনই, যখন একই প্ল্যাটফর্মে আমরা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর প্রচার দেখি। আপনি যখন ইসলাম ধর্মের সঠিক চর্চা (যেমন নামাজ, রোজা, তাকওয়া) শেখাচ্ছেন, তখন আপনার সংবাদ বা সম্পাদকীয় নীতিতে সেই ধর্মের মৌলিক অনুশাসনের প্রতিফলন থাকা উচিত। গত ০৭ মার্চ চাপাইনবাবগঞ্জে মসজিদ কমিটির একটি ঘোষণা ও সম্প্রতি কুষ্টিয়ার কুমারখালীর একটি খবর তারা যেভাবে উপস্থাপন করেছে, তা আমার ভ্রু কুঁচকে দিয়েছে। উভয়খানে এলাকাবাসী সম্মিলিতভাবে সাউন্ড বক্স ও উচ্চশব্দে গান-বাজনা নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল। প্রথম আলো সেই খবরটিকে এমন নেতিবাচকভাবে তুলে ধরেছে, যেন এটি কোনো অন্যায় বা পশ্চাৎপদ কাজ।

প্রশ্ন যেখানে জাগে: আদর্শ নাকি স্রেফ 'ভিউ' বাণিজ্য?

এখানেই ইসলামের অনুশাসন আর প্রথম আলোর সাংবাদিকতার সংঘাত বাধে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ: ইসলামে উচ্চস্বরে গান-বাজনা বা শোরগোল নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। অথচ প্রথম আলো যখন নামাজ-রোজার শিক্ষা দিচ্ছে, ঠিক তখনই গান-বাজনা নিষিদ্ধের উদ্যোগকে 'নেতিবাচক' হিসেবে তুলে ধরছে। দ্বিচারিতা: আপনি যদি কুরআন-সুন্নাহর পথ দেখান, তবে সেই সুন্নাহর পরিপন্থী কাজকে কেন 'প্রগতিশীলতা'র মোড়কে প্রমোট করছেন? এই বৈপরীত্য থেকে একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়—প্রথম আলোর এই ধর্মচর্চা মূলত একটি বাণিজ্যিক কৌশল। তারা জানে এ দেশের বিশাল এক জনগোষ্ঠী ধর্মপ্রাণ। সেই বিশাল অডিয়েন্সের ‘ভিউ’ বা ক্লিক পাওয়ার জন্যই তারা অ্যাপে ধর্মীয় কন্টেন্ট রাখে। অর্থাৎ, আপনার ইমান বা আমল সংশোধন করা তাদের উদ্দেশ্য নয়; বরং ধর্মের মোড়কে নিজেদের কাটতি বাড়ানোই মূল লক্ষ্য। যখন ধর্মীয় অনুভূতি থেকে ভিউ পাওয়া যায়, তখন তারা ‘মৌলভি’; আবার যখন আধুনিকতার বুলি আউড়ে ক্লিক পাওয়া যায়, তখন তারা ‘লিবারেল’। একেই হয়তো বলে ‘সুবিধাবাদী সাংবাদিকতা’।

পবিত্র কুরআনে সূরা বাকারার ১৪ নং আয়াত নিয়ে আলোচনা করে আজকের আর্টিকেলের ইতি টানব।

তরজমাঃ আর যখন তারা মুমিনদের সংস্পর্শে আসে, তখন বলে—আমরা ঈমান এনেছি। কিন্তু যখন তারা গোপনে তাদের শয়তানদের (নেতাদের) সাথে মিলিত হয়, তখন বলে—আমরা তো তোমাদের সাথেই আছি, আমরা কেবল তাদের সাথে উপহাস করছি মাত্র।" ​আপনার আলোচনার সাথে এই আয়াতের মিল: ​আমি প্রথম আলোর যে 'দ্বিচারিতা' বা 'ডাবল স্ট্যান্ডার্ড' নিয়ে কথা বলছি, এই আয়াতটি ঠিক সেই মানসিকতাকেই চিহ্নিত করে। ​মুমিনদের সামনে 'ঈমানদার': প্রথম আলো যখন তাদের অ্যাপে 'তাহাজ্জুদ নামাজ', 'অজুর দোয়া' বা 'খুশু-খুজু' নিয়ে বিস্তারিত আর্টিকেল লেখে, তখন তারা যেন বলতে চায়—"আমরাও তোমাদের (ধর্মপ্রাণ মানুষের) সাথে আছি, আমরাও ইসলাম চর্চা করি।" ​একান্তে 'শয়তানদের' সাথে: যখন তারা সম্পাদকীয় নীতি বা খবরের বিশ্লেষণে যায়, তখন তারা তাদের তথাকথিত 'প্রগতিশীল' বা 'লিবারেল' প্রভুদের তুষ্ট করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। তখন গান-বাজনা বা শরিয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তারা যেন পরোক্ষভাবে ইসলামি অনুশাসন পালনকারীদের উপহাস (Mockery) করে।

এখন প্রশ্ন জাগে,​আয়াতে 'শয়তান' বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে? ​তাফসীরবিদদের মতে, এখানে 'শয়তান' বলতে মুনাফিকদের সেই কুচক্রী নেতাদের বোঝানো হয়েছে যারা পর্দার আড়াল থেকে ইসলাম বিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি সেই সব আদর্শিক বা বাণিজ্যিক গোষ্ঠীকে নির্দেশ করতে পারে, যাদের খুশি রাখার জন্য একটি পক্ষ ধর্মের খোলস পরে থাকে।

আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে এ ধরনের মুনাফেকি থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দিন,আমিন।

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ