সর্বহারা সম্রাট-1
সর্বহারা সম্রাট-1
মুহাম্মাদ আইয়ুব
নাহুমিরের বছর "রওযাতুল আদবে" একটা প্রবাদ পড়েছিলাম
"হুব্বুশ শাই ইউমি ওয়াসুমম" তথা বস্তুর ভালোবাসা মানুষকে অন্ধ ও বধির করে দেয়।
আধুনিক পৃথিবীতে "গনতন্ত্র" তত্ত্বের সাথে মূলনীতিটা দারুণভাবে প্রাসঙ্গিক।
ক্ষমতাসীন বা বিরোধীদল সবার কামড়াকামড়ি ঐ এক জায়গায় ক্ষমতা ক্ষমতা ক্ষমতা এজন্য মোক্ষম হাতিয়ার রাজনীতি।
আর এই রাজনীতির প্রথম মূলনীতি
"রাজনীতিতে শেষ বলে কোন কথা নেই"
রাজনীতির উৎপত্তি কবে কোথায় নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাজনীতির বিপত্তি নিয়ে কোন বিতর্ক নেই
পাঠক!তাহলে আসুন রাজনীতির চক্করে ক্ষমতার মোহে এক ঐতিহাসিক বিপত্তির কথা জেনে আসি আজকের লেখায়।
হিজরতের ৬ষ্ট বছর বিশ্ব শাসন করা রাজা মহারাজা সম্রাট বাদশাহদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে চিঠি পাঠাচ্ছেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
এরই সূত্রধরে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত দূত
হযরত দিহইয়া কালবী রা.রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াসের উদ্দেশ্যে বের হন।
নবীজীর পবিত্র চিঠি নিয়ে প্রথমে বসরায় যান এবং হারেস গাসসানিকে দেন,
হারেস দূতকে বাইতুল মুকাদ্দাস পাঠিয়ে দেয় কেননা বাদশাহ তখন সেখানে অবস্থান করছিলেন।
হযরত দিহইয়া ক্বলবি রা. হারেস গাসসানির মাধ্যমে কায়সারের দরবারে উপস্থিত হয়ে নবীজীর সা.পত্রটি সম্রাটের হাতে তুলে দেন।
সম্রাট কায়সার চিঠি পেয়ে তার পাইক পেয়াদাদের মাধ্যমে সংবাদ দিলেন যে, এ ব্যক্তির
( হুজুর সা.) বংশের কোন লোক যদি এখানে পাও তাহলে তাকে দরবারে নিয়ে এসো। ঘটনাক্রমে তারা আবু সুফিয়ান ও আরবের কতিপয় ব্যবসায়ীকে পেয়ে গেল সেখানে তাই তাদেরকে দরবারে উপস্থিত করা হল।
আড়ম্বরপূর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত সম্রাট
জাঁকজমকতার সাথে আসন গ্রহণ করলেন। সিংহাসনের আশেপাশে রাজন্যবর্গ মন্ত্রী ও পাদ্রী সন্যাসীরা দন্ডায়মান, ঠিক সে সময় আরবের ব্যবসায়ী দলটিকে রাজ দরবারে উপস্থিত করে সব দরজা বন্ধ দেয়া হল।
বাদশাহ দোভাষী ডাকলেন
আরবদের সাথে কথোপকথন শুরু হল,
সম্রাট গুরুগম্ভীর আওয়াজে প্রশ্ন করেন,
যে ব্যক্তি নবুওয়াত দাবী করছে কে তার নিকটাত্মীয় তোমাদের মধ্যে ?
আবু সুফিয়ান বলল, আমি।
সম্রাট তাকে কাছে আসতে বলে অন্যদের তার পিছনে দাঁড় করিয়ে বললেন, যদি এ
(আবু সুফিয়ান)কোন মিথ্যা বা ভুল তথ্য দেয় তাহলে অবশ্যই তোমরা ধরিয়ে দিবে।
তারপর দুজনের মধ্যে কথোপকথন শুরু হয়ঃ
সম্রাটঃ নবুওয়াতের দাবীদার এই লোকটির বংশ কেমন?
আবু সুফিয়ানঃ উচ্চ বংশের।
সম্রাটঃ ইতিপূর্বে তাঁর বংশ থেকে কেউ নবুওয়াত দাবী করেছে?
আবু সুফিয়ানঃনা।
সম্রাটঃ তাঁর বাপ দাদার কেউ বাদশাহ ছিল?
আবু সুফিয়ানঃ না।
সম্রাটঃ তাঁর ধর্মগ্রহণকারীরা দুর্বল নাকি সবল?
আবু সুফিয়ানঃ অধিকাংশ দূর্বল
সম্রাটঃ তাঁর অনুসারী সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে না হ্রাস পাচ্ছে ?
আবু সুফিয়ানঃ দিনদিন বাড়ছে।
সম্রাটঃ তাঁর ধর্ম গ্রহণ করে আবার কেউ বেরিয়ে এসেছে?
আবু সুফিয়ানঃ না।
সম্রাটঃ নবুওয়াতের দাবীদার এই লোকটা আগে কখনো মিথ্যা বলেছে?
আবু সুফিয়ানঃ না।
সম্রাটঃ কখনো কি তিনি ওয়াদা ভঙ্গ করেছেন?
আবু সুফিয়ানঃ এখনো করেননি তবে এখন তাঁর ও আমাদের মাঝে একটি চুক্তি ( হুদায়বিয়ার সন্ধি) চলছে জানিনা সামনে সে কি করবে?
সম্রাটঃ তাঁর সাথে তোমরা কোন যুদ্ধ করেছ?
আবু সুফিয়ানঃ হ্যাঁ।
সম্রাটঃ ফলাফল কি?
আবু সুফিয়ানঃ কখনো আমরা জয়লাভ করেছি কখনো সে।
সম্রাটঃ তিনি তোমাদের কোন পথের দাওয়াত দেন?
আবু সুফিয়ানঃ তোমরা এক আল্লাহর ইবাদাত কর তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না, মূর্তিপূজা ত্যাগ কর, নামাজ পড়, সত্য বল, লজ্জাশীল হও, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখ।
প্রশ্নোত্তরের পর সম্রাট বলল,তুমি বলেছ তিনি উচ্চ বংশীয় আসলে সমস্ত নবীগণ এমনই, নবীরা সর্বদা উচ্চবংশীয় হয়ে থাকেন। তুমি বলেছ যে ইতিপূর্বে তাঁর বংশের কেউ নবুওয়াত দাবী করেনি যদি এমনটা করত তাহলে বুঝতাম তিনি পূর্বসূরীদের অনুসরণ করছেন।
তুমি স্বীকার করেছ যে,তাঁর বংশে পূর্বে কেউ বাদশাহ ছিল না যদি এমন থাকত তাহলে বুঝতাম তিনি পূর্বসূরীদের বাদশাহী ফিরে পেতে চান।
তুমিই বলেছ নবুওয়াত দাবীর পূর্বে তিনি কখনো মিথ্যা বলেননি
তাহলে যিনি মানুষের সাথে মিথ্যা বলেননি তিনি আল্লাহর ব্যাপারে কি করে মিথ্যা বলবেন?
তুমিই বলেছ দুর্বলরা তাঁর সঙ্গী, শুনে রাখ নবীদের সঙ্গীরা প্রথম প্রথম দুর্বলরাই বেশি হয়।
তুমি স্বীকার করেছ তাঁর অনুসারী সংখ্যা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আসলে ইমানের বিষয়টি সর্বদা এমনই তাঁদের অনুসারী সংখ্যা সবসময় বাড়তেই থাকে।
তোমারই স্বীকারোক্তি যে,কেউ তাঁর ধর্ম থেকে মুরতাদ হয়নি সুতরাং তোমাদের জানা থাকা উচিত ঈমানের সৌন্দর্য এখানেই, যখন কেউ হৃদয় দিয়ে ঈমানের স্বাদ অনুভব করে তখন সে কখনোই এর থেকে বের হতে চায় না।
তুমি এও বলেছ যে,তিনি আজো পর্যন্ত কারো সাথে ওয়াদা ভঙ্গ করেননি ;শুনে রাখ রাসূলদের অবস্থা হুবহু এমন যে,তারা কখনো অঙ্গীকার ভঙ্গ বা কারো সাথে গাদ্দারি করেন না।
তুমি আমাদেরকে বলল,তিনি এক আল্লাহর ইবাদাত, শিরক,মূর্তিপূজা থেকে নিষেধ করেন, পূতপবিত্রতা ও আত্মিয়তার নির্দেশ দেন।
সুতরাং মন দিয়ে শুন, তুমি যা বলছ তা যদি সত্যি হয় তাহলে অচিরেই তিনি আমার পায়ের নিচের মাটিরও মালিক হয়ে যাবেন।
আমি জানতাম অচিরেই একজন রাসূলের আবির্ভাব হবে কিন্তু তিনি যে,তোমাদের আরবদের থেকে হবে এটা আমার ধারণায় ছিল না।
যদি আমি তাঁর কাছে পৌঁছতে পারতাম তাহলে অবশ্যই পৌঁছে যেতাম তার পা দু'খানা ধুয়ে দিতাম।
তারপর তিনি নবীজীর সা.চিঠি মুবারক খুলে পরম যত্ন ভালোবাসা ও আগ্রহ নিয়ে পড়তে শুরু করলেন
بسم الله الرحمن الرحيم
পরম করুনাময় দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। আল্লাহর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ সা.এর পক্ষ থেকে রোমের বাদশাহ হিরাক্লিয়াসের নামে।
ঐ ব্যক্তির উপর শান্তি বর্ষিত হোক যে হেদায়েতের অনুসারী।
আমি তোমাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি ;মুসলমান হও নিরাপদ থাকবে।
আল্লাহ পাক তোমাকে দিগুণ মর্যাদার অধিকারী করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নাও তাহলে তোমার প্রজাদের গুনাহ ও তোমার উপর বর্তাবে।
হে কিতাবধারীরা! আমাদের ও তোমাদের মাঝে মেলবন্ধন তৈরী করে এমন বিষয়ের দিকে এসো, আর তা হল আমরা এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদাত করব না। একে অপরকে প্রভু বানাব না। আর যদি তোমরা বিষয়টি না মান তাহলে সাক্ষী থেকো আমরা মুসলমান।
সম্রাট ও আবু সুফিয়ানের কথাবার্তায় দরবারীরা আগেই চটে ছিল তারপর চিঠি পর্ব শেষ হলে সম্রাট তার সভাসদদের লক্ষ্য করে বলল, হে রোমবাসী! যদি তোমরা সফলতা ও বাদশাহী ধরে রাখতে চাও তাহলে এই নবীর কথা মেনে নাও।
দরবারিরা তখন রাগে ক্ষোভে ফুঁসে উঠল। জংলী গাধার মতো গোঙাতে গোঙাতে দরজার দিকে ছুটতে লাগল।
এ দিকে সম্রাট দরবারীদের এমন পাগলামি দেখে তাদের ঈমানের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে বলল সবাই এদিকে এসো।
সবাই জায়গামতো আসলে বলল,আমি তো তোমাদের পরীক্ষা করলাম মাত্র।
আসলে আমি তোমাদের যাচাই করে নিলাম যে, নিজ ধর্মে তোমরা কতটা অটল অবিচল।
সাব্বাশ সাব্বাশ! নিজ ধর্মের প্রতি আনুগত্যতা দেখে আমার মনটা ভরে গেল খুশিতে। দরবারীরা সম্রাটের কথা শুনে তৎক্ষনাৎ সেজদায় পড়ে গেল।
অপরদিকে আবু সুফিয়ানকে দরবার থেকে বের করে দেয়া হয়।
ফেরার পথে আবু সুফিয়ান সাথীদের বলল,দেখছ! আবু কাবশার ছেলের ( মুহাম্মাদ সা.) ব্যাপারটা কতদূর গড়িয়েছে? রোম সম্রাট ও তাঁকে ভয় পাওয়া শুরু করেছে।
কায়সার যেহেতু তাওরাত ইঞ্জিলের অভিজ্ঞ ও জ্যোতির্বিদ্যায় পারদর্শী ছিল এজন্য শেষ নবীর আগমন সম্পর্কে অবগত ছিল। আবু সুফিয়ান থেকে সার্বিক অবস্থা জেনে তার হৃদয়ে আলোর মশাল জ্বলে উঠেছিল কিন্তু রাজত্বের লোভ ও আশার অন্ধকার সে আলোকে নিভিয়ে দেয় এবং সে থাকে হেদায়েত বঞ্চিত।
আহ! ক্ষমতা আহ!

0 মন্তব্য রয়েছে