ইরানে যুক্তরাষ্ট্র; মরার উপর খাঁড়ার ঘা

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র; মরার উপর খাঁড়ার ঘা

মুহাম্মাদ আইয়ুব

টিম মার্শালের পাওয়ার অব জিওগ্রাফি বাংলা অনুবাদের সম্পাদন করতে গিয়ে চোখ কপালে। ইরান নিয়ে লেখকের যে গবেষণা তা শতভাগ সত্য প্রতিফলিত হচ্ছে দেখে। ইরানের সাথে যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে যে সব সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে তা তিনি প্রমাণ সহ দেখিয়েছেন। আসুন দেখি, 'দাশত-এ-কাভির' মূলত 'মহা লবণ মরুভূমি' হিসেবে পরিচিত।

এটি প্রায় ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৩২০ কিলোমিটার প্রশস্ত— আয়তনে যা নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়ামের সম্মিলিত আকারের সমান। আমি এর কিছু অংশের মধ্য দিয়ে গাড়ি চালিয়ে গিয়েছি; সেখানে নিস্তেজ, সমতল ঝোপঝাড় ছাড়া দেখার মতো তেমন কিছুই নেই। তবে সেখানে দেখার মতো কিছু খুঁজে বের করাটাও খুব একটা বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। কারণ, এই মরুভূমির কোনো কোনো জায়গায় লবণের স্তরের নিচে কাদার এমন গভীর চোরাবালি লুকিয়ে থাকে যেখানে একজন মানুষ অনায়াসেই ডুবে যেতে পারে— আর মরুভূমিতে ডুবে মরাটা অত্যন্ত করুণ ও হাস্যকর একটি মৃত্যু হবে। অন্য প্রধান মরুভূমিটির নাম শুনতে হয়তো কিছুটা আকর্ষণীয় মনে হতে পারে, যতক্ষণ না আপনি জানবেন যে 'দাশত-এ-লুত' মানে হলো 'একাকীত্বের মরুভূমি'।

আর এই কারণেই, আপনি যদি রণকামী বা যুদ্ধবাজ স্বভাবেরও হন, তবুও ইরান আক্রমণ করার কথা ভাববেন না; বিশেষ করে বর্তমান যুগে যখন আধুনিক রাষ্ট্রগুলো বিশাল ও পেশাদার সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশটি প্রায় সবসময়ই খবরের শিরোনামে থাকে: মধ্যপ্রাচ্যের এক শক্তিশালী শক্তি, সন্ত্রাসের সাথে যুক্ত এক দমনমূলক শাসনব্যবস্থা; ইসরায়েলের সাথে চরম উত্তেজনারত এক পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র এবং আমেরিকার সাথে যাঁর বৈরিতা নিয়মিত সংঘাতের রূপ নেয়। তবুও আমেরিকানরা বা অন্য কেউ সেখানে সেনা পাঠাতে রীতিমতো দ্বিধাবোধ করে।

২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে বুশ প্রশাসনের কিছু কট্টরপন্থী ইরান আক্রমণের জন্য প্রেসিডেন্টকে চাপ দিয়েছিলেন; কিন্তু বিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্তিরই জয় হয়েছিল। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল—যিনি জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফ-এর সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন—যুক্তি দিয়েছিলেন যে, শুধু বিমান হামলা চালিয়ে খুব একটা সুফল মিলবে না এবং এর ফলে যে যুদ্ধের সূচনা হবে তার জন্য সরাসরি পদাতিক বাহিনী বা 'বুটস অন দ্য গ্রাউন্ড' প্রয়োজন হবে। তিনি তখন সেই পুরনো প্রবাদটি মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, "আমরা মরুভূমি জয় করতে জানি, পাহাড় নয়।" আমেরিকা ও ইরানের ইতিহাস দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু ইরানের ইতিহাস মূলত দেশটির পাহাড়ে অসংখ্য ভিনদেশি সৈন্যের করুণ মৃত্যুর কাহিনী দিয়েই রচিত"

হরমুজ নিয়ে লেখকের মূল্যায়ন ও প্রশংসনীয়।

তিনি লিখেছেন, ইরানের প্রধান রপ্তানি পথগুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালী হয়ে ওমান উপসাগর। উন্মুক্ত সমুদ্রে পৌঁছানোর জন্য এটিই ইরানের একমাত্র পথ, যার সংকীর্ণতম অংশটি মাত্র ৩৪ কিলোমিটার চওড়া। সেখানে যাতায়াতের জন্য প্রতিটি লেনের প্রস্থ মাত্র ৩ কিলোমিটার এবং দুর্ঘটনা এড়াতে দুই লেনের মাঝে ৩ কিলোমিটারের একটি নিরাপদ বাফার জোন রাখা হয়েছে। ইরানের জন্য এই প্রণালীটি যেন একটি 'দুধারী তলোয়ার'। ইরান যে কখনোই বড় কোনো নৌ-শক্তিতে পরিণত হতে পারেনি, তার অন্যতম কারণ হলো একে খুব সহজেই সমুদ্রপথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা সম্ভব। তবে এই প্রণালীর সংকীর্ণতা তেহরানকে একটি বিশেষ সুবিধাও দেয়—তারা চাইলে এই পথটি সবার জন্য বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিতে পারে। যেহেতু বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়েই যায়, তাই এটি বন্ধ করার অর্থ হবে গোটা বিশ্বের জন্য চরম দুর্ভোগ। যদিও এমন পদক্ষেপ ইরানের নিজেরও ক্ষতি করবে এবং হয়তো যুদ্ধের সূচনা ঘটাবে, তবুও এটি তাদের হাতের একটি তুরুপের তাস; আর বর্তমান শাসকগোষ্ঠী একে কার্যকর অস্ত্রে পরিণত করতে যথেষ্ট বিনিয়োগও করেছে। ইরানি বাহিনী প্রায়ই ঝাঁকে ঝাঁকে ছোট দ্রুতগামী নৌযান ব্যবহার করে বড় জাহাজগুলোকে ঘিরে ফেলার মহড়া দেয়। এসব ছোট নৌকার অনেকগুলোই আবার জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত। বড় মাপের কোনো সংঘাত শুরু হলে ইরান হয়তো ইরান-ইরাক যুদ্ধের মতো 'সুইসাইড স্কোয়াড' বা আত্মঘাতী বাহিনীও ব্যবহার করতে পারে। তাদের প্রথাগত নৌবাহিনী বা সাবমেরিন বহর হয়তো শত্রুপক্ষ খুব দ্রুতই খুঁজে বের করে অকেজো করে দেবে, কিন্তু উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র, মাইন স্থাপনে দক্ষ বিশেষ বাহিনী এবং এই 'ঝাঁক বেঁধে আক্রমণ' (Swarming tactics) পদ্ধতিটি কোনো শত্রুকে পিছু হঠতে বাধ্য করতে কিংবা সাময়িকভাবে প্রণালীটি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এর ফলে ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেল-গ্যাস রপ্তানিতে যে বিশাল বিপর্যয় নেমে আসবে, তাতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হবে এবং বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহ মন্দার মুখে পড়বে। যখনই তেহরান কোনো চাপে পড়ে, বিশেষ করে তাদের তেল রপ্তানি যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন তারা ২০১৮ সালে দেওয়া সেই হুঁশিয়ারিরই পুনরাবৃত্তি করে: 'আমরা নিশ্চিত করব তেহরানের পক্ষ থেকে সেই সতর্কবার্তাটি ছিল— ‘শত্রু যেন বুঝতে পারে যে, হয় সবাই হরমুজ প্রণালী ব্যবহার করবে, নতুবা কেউই পারবে না’। সংঘাত কি সত্যিই এতদূর গড়াবে কি না তা অজানা, তবে এই পর্যায়ের ভূ-রাজনৈতিক জুয়া খেলার ধরনটাই এমন। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় মার্কিনিদের হাতে এমন উন্নত পরিকল্পনা রয়েছে যা দিয়ে বড় কোনো যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের আক্রমণাত্মক সক্ষমতা প্রায় নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া সম্ভব।

অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো লোহিত সাগর পর্যন্ত তেল ও গ্যাস নেওয়ার জন্য বিকল্প পাইপলাইন তৈরি করছে, যাতে ট্যাঙ্কারগুলো সেখান থেকে ভারত মহাসাগরে পৌঁছাতে পারে। যদিও তারা আশা করছে যে, ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্রের কবলে তাদের পড়তে হবে না। আধুনিক ইরান আজ সংকটাপন্ন এক জাতি হলেও এর ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়। প্রাচীন বিশ্বে পারস্য সাম্রাজ্য ছিল অগ্রগণ্য এক সভ্যতা। গ্রিসের ইতিহাসের মতোই ইরানের ইতিহাসও সমানভাবে মহিমান্বিত, জাঁকজমকপূর্ণ এবং রক্তক্ষয়ী সংঘাতের আখ্যানে ঘেরা। তাই এই দুই শক্তির সংঘর্ষ কিংবা পরবর্তীকালে রোমের সাথে পারস্যের সংঘাত মোটেও বিস্ময়কর ছিল না। তবে এর আগে তাদের কিছুটা ‘স্থানীয় প্রতিকূলতা’ পার করতে হয়েছিল"

আমেরিকা যে ইরানে একদিন হামলা করবে সেটা ইরানের শাসক ও জনগন জানত যেমনটা লেখক বলেছেন, যুদ্ধ কেন অসম্ভব ছিল, তার আরও কারণ রয়েছে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীর ক্ষয়ক্ষতি আমেরিকান জনগণের সামরিক অভিযানের প্রতি আগ্রহ ও সহনশীলতাকে অনেক কমিয়ে দিয়েছে। ইরান এই বাস্তবতাটি খুব ভালো করেই জানে। তাই আমেরিকার তথাকথিত 'অন্যায় আগ্রাসন'-এর বিরুদ্ধে তারা একটি নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত বুক ফুলিয়ে রুখে দাঁড়াতে পারে।

তেহরান জানে যে উত্তেজনা চরম সীমায় পৌঁছালে তারা হয়তো বিমান হামলার শিকার হবে, কিন্তু মার্কিনিরা ইরাক সীমান্ত পাড়ি দিয়ে জাগ্রোস পর্বতমালা অতিক্রম করবে না, কিংবা পারস্য উপসাগরের জাহাজ থেকে বড় কোনো স্থলবাহিনী নামাবে না। ইরানের সামরিক সরঞ্জাম হয়তো ততটা উন্নত নয়, কিন্তু তাদের শক্তির উৎস হলো লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা এবং ১ লক্ষ ৯০ হাজার রিভল্যুশনারি গার্ড সদস্যসহ প্রায় ৬ লক্ষ সক্রিয় সেনা। তবে এই সামরিক সক্ষমতা ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকে বিন্দুমাত্র কমাতে পারেনি।

সব মিলিয়ে টিম মার্শালের যে গবেষণা তাতে আমেরিকা অলরেডি জেনেশুনে ঢুকে পড়েছে। যদি তারা ইসরায়েলের ইন্ধনে এ যুদ্ধে ঢুকে পড়ে তাহলে তারা বোকা। আমরা বাহির থেকে আমেরিকাকে খুব জ্ঞানী গুণী বুদ্ধিজীবী মনে করলেও তারা ততটা নয়।

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ