শাপলা বেচে দেওয়া ‘ধূর্ত’ আলেম ও একটি প্রজন্মের দীর্ঘশ্বাস
শাপলা চত্বরের সেই হৃদয়বিদারক ঘটনার পরের দিনের কথা। চারদিকে তখন শোক আর হাহাকার। আমরা মাদ্রাসার ছাত্ররা যখন মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি,তখন ক্লাসে এসে আমাদের একজন উস্তাদ নেতৃত্বের নির্বুদ্ধিতায় দুঃখে হাসছিলেন। সেই হাসি আনন্দের ছিল না,ছিল এক ধরণের তিক্ত করুণা। পরের ক্লাসে আরেকজন উস্তাদও একই ধরণের আফসোস করলেন। আমাদের উস্তাদগণ ছিলেন এদেশের সেরা মেধাবী এবং প্রথিতযশা আলেম কাজী সাহেব হুজুর রাহিমাহুল্লাহর হাতে গড়া ছাত্র। তাঁদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা নিয়ে কোনোকালেই প্রশ্ন ছিল না,বরং তাঁদের ওপর ছিল আমাদের অগাধ আস্থা।
কিন্তু সেই সময় এই 'হাসাহাসি'বা সমালোচনার কথা বাইরে বলার কোনো জো ছিল না। চারদিকে তখন এক ধরণের অন্ধ আবেগ আর হুজুগ কাজ করছিল। আমরা ছাত্ররা তখন শুধু সত্য প্রকাশের অপেক্ষায় ছিলাম। আজ দীর্ঘ সময় পর সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। সম্প্রতি লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট মনযুরুল হক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশ্ন তুলেছেন—"শাপলার বিচার কখনও হলে শাপলা যারা বেচে দিছে,সেই ‘আলেম’নামের ধূর্তদের বিচারও যেন হয়।"
তাঁর এই পোস্টে ন্যাশনাল উলামা অ্যালায়েন্সের সদস্য সচিব (ঢাকা দক্ষিণ) ও লেখক মুফতি শরাফত শরীফ মন্তব্য করেছেন,"আমি এই আলাপ করতে চাইছিলাম। এমনকি আমার যে উস্তায সেখানে ছিলেন,তাকে প্রশ্ন করা যাইত,ঢাকা অবরোধের প্রোগ্রাম কার নির্দেশে শাপলায় আসল?"
এই প্রশ্নগুলো আজ কেবল ব্যক্তিগত আলাপে সীমাবদ্ধ নেই,বরং এটি এখন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এক বিশাল জনশক্তির ধ্বংসের কারণ খোঁজার প্রচেষ্টায় পরিণত হয়েছে।
১.
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার মূল স্তম্ভ হলো দেওবন্দি আদর্শ। ঐতিহাসিকভাবেই দেওবন্দি উলামায়ে কেরাম জামায়াতে ইসলামীর প্রবর্তক সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদীর আকিদাগত ব্যাখ্যার কট্টর বিরোধী। আম্বিয়ায়ে কেরামের সমালোচনা এবং সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে দেওবন্দি আলেমদের কাছে জামায়াত সবসময়ই একটি 'ভ্রান্ত আকিদার'রাজনৈতিক দল হিসেবে চিহ্নিত।
শাপলা চত্বরের আন্দোলনে যখন হেফাজতে ইসলাম আত্মপ্রকাশ করে,তখন এর ১৩ দফা ছিল বিশুদ্ধ ধর্মীয় আবেগের প্রতিফলন। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো,নেতৃত্বের একটি অংশ সংখ্যার মোহে পড়ে তাদের আজন্ম আদর্শিক শত্রু জামায়াত-শিবিরের সাথে হাত মেলায়। এটি ছিল এক ভয়াবহ নৈতিক পরাজয়। যে দলটির আকিদা নিয়ে শত বছরের আপত্তি,তাদেরই সাথে একই মঞ্চে দাঁড়ানো বা তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের পথ প্রশস্ত করে দেওয়া ছিল চরম অদূরদর্শিতা। যখন একটি ঈমানী আন্দোলন তার বিশুদ্ধতা হারিয়ে বিতর্কিত শক্তির সাথে মিশে যায়,তখন তা আর সর্বজনীন থাকে না— শাপলা চত্বরের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই ঘটেছিল।
২.
এই চরম সংকটে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ একটি অত্যন্ত দূরদর্শী প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন,১৩ দফার মধ্যে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধের দাবিটি অন্তর্ভুক্ত করা হোক। এটি কোনো নিছক রাজনৈতিক চাল ছিল না,বরং ছিল একটি গভীর আদর্শিক ও কৌশলগত অবস্থান। তিনি জানতেন, জামায়াত-শিবিরের ছায়া এই আন্দোলনের সাথে লেগে থাকা মানেই হলো সরকারকে দমন— পীড়নের একটি সুবর্ণ সুযোগ করে দেওয়া।
যদি সেদিন হেফাজত নেতৃত্ব এই প্রস্তাবটি গ্রহণ করত,তবে আন্দোলনটি সরকারের কাছে 'রাজনৈতিক' হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার সুযোগ পেত না। কিন্তু নেতৃত্বের একটি অংশ মাওলানা মাসউদকে 'সরকারঘেঁষা'তকমা দিয়ে তাঁর প্রস্তাব উড়িয়ে দেয়। আজ মুফতি শরাফত শরীফদের মতো ব্যক্তিদের প্রশ্ন প্রমাণ করে যে,সেদিন নেতৃত্বকে আসলে কেউ না কেউ ভুল পথে পরিচালিত করছিল। কার নির্দেশে ঢাকা অবরোধের কর্মসূচি শাপলার মতো একটি 'ডেড এন্ড'— এ এসে থামল,তা আজও এক রহস্য।
মাওলানা আনওয়ার শাহ রাহিমাহুল্লাহর দূরদর্শী পর্যবেক্ষণ
শাপলা চত্বরের সেই অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেছিলেন কিশোরগঞ্জ জামিয়া ইমদাদিয়ার তৎকালীন মুহতামিম মাওলানা আনওয়ার শাহ রাহিমাহুল্লাহ । তিনি নেতৃত্বের একাংশের সমালোচনা করে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন— "আছর পর্যন্ত শাপলায় অবস্থান ছিল ইলহামি সিদ্ধান্ত,কিন্তু এরপর সেখানে অবস্থান চালিয়ে নেওয়া ছিল চরম নির্বুদ্ধিতা।"
উনার এই একটি বাক্যেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে,আন্দোলনের নেতৃত্ব একটি পর্যায়ে গিয়ে তাঁদের নিয়ন্ত্রণ ও প্রজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছিলেন। আছর পর্যন্ত শাপলা চত্বরের বিশাল উপস্থিতি সরকারকে একটি শক্তিশালী বার্তা দিতে সক্ষম হয়েছিল। সেই মুহূর্তে একটি সুশৃঙ্খল সমাপ্তি ঘোষণা করলে আন্দোলনটি ইতিহাসের সফলতম ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে টিকে থাকত। কিন্তু কোনো ধরণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই সেখানে রাত যাপনের সিদ্ধান্ত মূলত কয়েক লাখ নিরস্ত্র মানুষকে রাষ্ট্রীয় শক্তির কামানের মুখে ঠেলে দেওয়ার নামান্তর ছিল। মাওলানা আনওয়ার শাহর মতো বিজ্ঞ আলেমদের এই সতর্কতা সেদিন যারা উপেক্ষা করেছিলেন,আজ ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাঁরাই প্রধান অভিযুক্ত।
৩.
শাপলা চত্বরের সেই রাতের নির্মমতা যখন কয়েক লাখ নিরস্ত্র মানুষের ওপর নেমে এল,তখন শীর্ষ নেতৃত্বের একটি বড় অংশকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। সাধারণ মাদ্রাসা ছাত্ররা যখন নেতার নির্দেশের অপেক্ষায় রাজপথে বসে ছিল, তখন নেতারা কেন নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেলেন? আজ যখন মনযুরুল হকের মতো ব্যক্তিরা "শাপলা বেচে দেওয়া ধূর্তদের" বিচারের দাবি তোলেন,তখন সেই সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
ছাত্ররা জেল খাটল,পঙ্গু হলো,মাদ্রাসার পড়াশোনা ছাড়ল— অথচ নেতারা পরবর্তীতে সরকারের সাথে বিভিন্ন লিয়াজোঁর মাধ্যমে নিজেদের মাদ্রাসার স্বীকৃতি বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেন। এই যে 'সিলেক্টিভ'সুবিধা ভোগ করা,এটিই প্রমাণ করে যে একটি অংশ আসলে সাধারণ কর্মীদের ত্যাগের বিনিময়ে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিয়েছিলেন। উস্তাদদের সেই 'দুঃখের হাসি'ছিল মূলত এই অপরিণামদর্শী এবং সুবিধাবাদী নেতৃত্বের প্রতি এক নিরব প্রতিবাদ।
৪.
অতীতের এই ভয়াবহ গ্লানি থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের মাদ্রাসা প্রধান এবং শিক্ষকদের প্রতি আমাদের বিনীত আহ্বান—ছাত্রদের আর কোনো রাজনৈতিক দাবার ঘুঁটি হতে দেবেন না।
ক. মাদ্রাসা ছাত্রদের মূল দায়িত্ব হলো ইলমে দ্বীন অর্জন করা। আবেগ দিয়ে আন্দোলন হয়,কিন্তু সমাজ পরিবর্তন হয় জ্ঞান দিয়ে। ছাত্রদের কিতাবখানায় ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।
খ. জামায়াতের মতো ভ্রান্ত আকিদার লোকদের সাথে সাময়িক লাভের আশায় জোটবদ্ধ হওয়া যে কতটা আত্মঘাতী হতে পারে,তা ছাত্রদের শিক্ষা দিতে হবে।
গ. ছাত্রদের বোঝাতে হবে যে,রাজনীতির ময়দানে স্লোগান দেওয়ার চেয়ে একজন দক্ষ আলেম হওয়া অনেক বেশি জিহাদ। রাজপথের উন্মাদনা অনেক সময় মেধাবী ছাত্রদের ক্যারিয়ার ধ্বংস করে দেয়।
৫.
শাপলা চত্বরের ঘটনা আমাদের শিখিয়েছে যে,আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ভ্রান্ত আকিদার লোকদের সাথে জোট বেঁধে কখনো কোনো মহৎ উদ্দেশ্য সফল করা যায় না। মাওলানা আনওয়ার শাহ রাহিমাহুল্লাহ এবং মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ হাফিযাহুল্লাহ সেই সতর্কবাণী যদি সেদিন শোনা হতো,তবে হয়তো ইতিহাসের গতিপথ ভিন্ন হতো। নেতৃত্বের ব্যর্থতা এবং আদর্শিক বিচ্যুতির খেসারত দিতে হয়েছে নিরপরাধ ছাত্রদের।
এখন সময় এসেছে ঘুরে দাঁড়ানোর। আবেগ নয়,বিবেকের দ্বারা পরিচালিত হতে হবে। মাদ্রাসার আঙিনাগুলো আবার মুখরিত হোক কিতাব পাঠের গুঞ্জনে। ছাত্ররা যেন আর কোনো রাজনৈতিক নেতার উচ্চাভিলাষের শিকার না হয়। কাজী সাহেব হুজুর রাহিমাহুল্লাহর ছাত্ররা সেদিন যে আফসোস করেছিলেন,তা আজ আমাদের সবার আফসোসে পরিণত হয়েছে। পড়াশোনার টেবিলেই হোক আমাদের আগামীর বিপ্লব। যারা সেদিন আন্দোলনকে বেচে দিয়েছিল,ইতিহাসের আদালত তাদের ক্ষমা করবে না;কিন্তু আমরা আমাদের ছাত্রদের সুরক্ষিত রাখার মাধ্যমে সেই ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারি।
আবুদ্দারদা আব্দুল্লাহ ,সহকারী সম্পাদক,স্বাধীনতার বার্তা
মতামত লেখকের নিজস্ব

0 মন্তব্য রয়েছে