সৌদি আরবে ১৪ দিন
সৌদি আরবে ১৪ দিন (৫ম পর্ব)
গতরাতে প্রচন্ড জর এসেছিল,
নাপা খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম এখন একটু ভালো লাগছে।
হেরেম শরীফে নামাজ পড়ার ইচ্ছা থাকলেও সময়ের সাথে না পেরে হোটেলের মসজিদে জামাত ধরলাম।
সময় দ্রুত চলে যাচ্ছে অথচ এখনো কত কাজ বাকি নামাজ পড়ে কাফেলা নিয়ে মসজিদে আয়েশায় চলে গেলাম নতুন ওমরাহ করতে।
এবার ওমরাহ করব আমার জামিয়া আবু বকর সিদ্দিক রাঃ মাদ্রাসার সম্মানিত আধুনিক রূপকার জনাব মরহুম আসানুর রহমান শিকদার সাহেবের পক্ষ থেকে।
এই ভদ্রলোকের শুধু প্রশংসা শুনেছি কিন্তু কখনো দেখার সৌভাগ্য হয়নি।তার হাতেগড়া প্রতিষ্ঠানে আমি মুহতামিম।
তারা প্রতি অদৃশ্য ভালোলাগা, মুগ্ধতা,শ্রদ্ধা ভালোবাসা থেকে তাঁর জন্য এতটুকু কাজ করতেই হবে। মরে গেলে আর থাকে কি। বেঁচে থাকতেই আপন পর হয়ে যায় আর মরে গেলে তো সব গেল।
মিসফালা থেকে গাড়িতে উঠলাম।নিউ ব্রান্ডের গাড়ি ড্রাইভার ভদ্রলোকের বাড়ি কক্সবাজারে তবে জন্ম, পড়াশোনা বিয়েশাদি সব এখানে। দেখতে মিশরি মিশরি মনে হয়।
কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষায় ভাঙাচোরা কিছু বলতে পারেন শুকুর আলহামদুলিল্লাহ।
গাড়িটা নিজের; ১ লাখ ৭০ হাজার রিয়ালে কিনেছে ।
আমাদের মধ্যে একজন জিজ্ঞেস করল,দেশে যাবে না? সোজা উত্তর, পাগল না হলে কেউ দেশে যায়? প্রবাসীদের বলা হয় রেমিট্যান্স যোদ্ধা, রাস্ট্রের ফুসফুস অথচ তাদের মনে কত ব্যাথা নিজ দেশ নিয়ে।
দেশের নতুন পুরাতন ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদদের কাছে এর কোন উত্তর আছে?
এখানকার গাড়ি চালকদের শতকরা ৯৫ জনকে কি সাংঘাতিক পাজি বলা ঠিক হবে?
উঠানোর সময় মধু মাখিয়ে আর নামানোর সময় সোজা গলা ধাক্কা।ওমরাহ শেষ করে রুমে ফিরতে সকাল ১০ টা বেজে গেল।
আল্লাহ পাকের রহম ছাড়া কোনদিন কি সম্ভব ছিল?
আজ পবিত্র মাটিতে আজ প্রথমবার পূর্ণাঙ্গ কুরআন খতম হল আলহামদুলিল্লাহ,গতবারের কষ্টে কিছুটা হলেও প্রলেপ দেয়া গেল।
ফোন অন করে অনলাইনে ঢুকে দেখি ম্যাসেজে ইনবক্স ভরা।সবাইকে কমবেশ রিপ্লাই দিয়ে প্রয়োজন সেরে কাপড় চোপড় ধুলাম।
গোসল সেরে আবার হেরেম শরীফের দিকে রওনা হলাম।
কবুতর চত্ত্বরের আশপাশটায় হরেক কিসিমে’র মানুষের দেখা মেলে।
পথে এক মহিলা বায়না ধরলে রিয়াল দাও।
মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ ডাকছি যেন ও আল্লাহর দোহাই না দেয়। কারণ আল্লাহর ওয়াস্তে ভিক্ষা চাইলে ফিরাইতে পারব না।
ভিক্ষুক ভদ্রমহিলা এই পেশায় নতুন মনে হল। আল্লাহর ওয়াস্তে দাও বলা ছেড়ে দিয়েছে আমিও হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
ফেরার পথে একই কান্ড আরেক বেচারির মনে হয় নতুন এই পেশায় নেমেছে "আল্লাহর নামে" চাইতে ভুলে গেছে আমিও বাঁচলাম।
ভিক্ষা একটি নিম্নমানের কাজ হলেও এর মধ্যে আর্ট আনতে হবে।
অবশ্য ভিক্ষুকদের কাছে পড়াশোনা মানে নরকে বাস করা, তারপর ও তাদের সুমহান(?) পেশার খাতিরে কিছু পলিসি জানা থাকা দরকার।
চাওয়ার সময় নিজেকে ভেঙেচুরে ফেলতে হবে ধনী বাবু ভাব নেওয়া যাবে না।
২য় তে দাতাকে ভালো করে বুঝিয়ে বলবে যে,আল্লাহর ওয়াস্তে দাও যিনি তোমাকে সম্পদ দিয়েছেন আবার আমার মতো ফকির বানিয়ে দিতে পারেন। জলদি জলদি পকেটে হাত দাও নইলে মরণ।
কারণ মুসলমানদের হৃদয়ে এখনো আল্লাহ বাস করেন পরম মমতায় দোর্দণ্ডপ্রতাপে।
সুতরাং তিনি উসিলা হলে কানাকড়ির আশা করা যায়।
যোহর পড়ে মাতাফে নেমে এলাম।প্রথম ওমরাহ করলাম নানা নানুর পক্ষ থেকে, আল্লাহ পাক তাঁদের কবরকে নূর দ্বারা ভরপুর করে দিন।
প্রচন্ড রোদ কিন্তু আল্লাহর বান্দা বান্দীদের সংখ্যা কখনও কমে না।
কালো গিলাফে আবৃত একটা ঘর অথচ কি আকর্ষণ সুবহানাল্লাহ!
২য় তাওয়াফ করলাম নানা শশুর নানা শাশুড়ীর জন্য খুব ভালো ছিলেন তাঁরা। দু'জনকেই দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল।আল্লাহ পাক তাঁদের কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন।
সকাল ১০ টায় অর্ধেক রুটি খেয়েছিলাম আর দুই তাওয়াফের মাঝে ১০ গ্লাস পানি এই আমার সারাদিনের আহার আল্লাহর রহমতে ক্ষুধারা এখনো হৈচৈ শুরু করেনি।
এখন আমার গন্তব্য আবারো মসজিদে আয়েশা।
এখনো কয়েকটি ওমরাহ বাকি রয়েছে অথচ সময় ফুরিয়ে এলো।
খালি পায়ে হাঁটতে চেয়েছিলাম কিন্তু সে ইশক আর ঈমান কোথায়? পারলাম না,সম্ভব না।
যতবার রোদের কবলে পড়ি ততবার জাহান্নামের কথা মনে পড়ে
"কি হবে উপায় আমার, কি হবে উপায়!
ইসলামের প্রথম মুয়াজ্জিন হযরত বেলাল রাঃ ; সাহাবিদের মধ্যে যে কয়জন বিরল সম্মানে ভূষিত তন্মধ্যে তিনি একজন।
এখানের রোদে তাঁর মাহাত্ম্য আর কুরবানী মনে হয় কিছুটা ধরতে পেরেছি।
আসরের নামাজ মসজিদে আয়েশায় পড়ব।অসাধারণ স্ট্রাকচার।একতলা মসজিদ কিন্তু ছাদ থেকে মেঝের দূরত্ব মিনিমাম ৫ তলা।
এই মসজিদের ওয়াশ ব্লক ও অভিনব পদ্ধতিতে বানানো চমৎকার।
বাদ আসর সঙ্গে সঙ্গে বয়ানে দাঁড়িয়ে গেলেন এক যুবক শায়খ অসাধারণ বয়ান।
কুরআনের আয়াতগুলো সূর দিয়ে পড়েন।বক্সের আওয়াজ একদম পারফেক্ট সময় থাকলে শিনা যেত কিন্তু ভাড়ার গাড়ি আর কতক্ষণ দাঁড়াবে ওমা!এসে দেখি গাড়ি আমায় রেখে চলে গেছে অথচ ড্রাইভার আমাকে বলল,আসর পড়ে আসো।
কষ্ট পেলাম তারচেয়ে বেশী চিন্তা ও তো আসার ভাড়া নিল না!
ড্রাইভারের বদ স্বভাবের কারণে একটি গাড়ি পাল্টিয়ে আরেকটায় উঠলাম।ড্রাইভার ভদ্রলোক আমার দেশী ভাই, মাদারীপুর শিবচর বাড়ি।
আট বছর ধরে এখানে আছে, বেশ ভালো আছে।দেশ নিয়ে অত চিন্তিত না। বলল,ভাই আমাদের কোন দাম আছে? দেশ নিয়ে অত মাথা ঘামানোর সময় নেই।
এখানে বেশ ভলো আছি।
ফুরফুরে মেজাজে আমরা কথা চালিয়ে গেলাম। প্রবাসে দেশী ভাই বিরাট নেআমত।
দেশের চাঁদাবাজদের রমরমা গল্প সুদূর বাংলা পেরিয়ে নবীর দেশেও চর্চিত হয়।
জাতি হিসেবে সত্যিই আমরা গর্বিত।
চলার পথে হেরেম শরীফের কাছেই রাস্তার ডাইনে বিশাল এক প্রজেক্ট দেখলাম।
ড্রাইভার ভাই বলল,এখনে আরেক নিওম সিটির কাজ চলছে।
এক সারিতে ৫০ তলা বিল্ডিং হবে ১০০ টা।
সম্পূর্ণ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত,দূষণ বায়ুরোধী এ সিটিতে শপিংমল, সুইমিংপুল, বিশ্বমানের সব রেস্টুরেন্ট,জিম,স্পা,গবেষণাগার,
লাইব্রেরি, মসজিদ,কালচারাল সেন্টার, মিউজিয়াম সবই থাকবে এখানে।
আল্লাহর হেরেমে তাঁর ইবাদাত বাদ দিয়ে দেহ আর নফস পূজার এ এক রমরমা বানিজ্যভূমি হচ্ছে সৌদি শাসকদের জন্য।
তাদের দৃষ্টিতে উঁচু উঁচু অট্টালিকা, আমোদপ্রমোদের মাঝে দুনিয়াবি সফলতা নিহিত।
অথচ এই সব বেকুবদের হুংকারে আজ প্রশান্ত মহাসাগর তো দূরের কথা স্বয়ং আরব সাগরেও ঢেউ উঠে না।
শুকনো রুটির সম্বল করে সে ঈমান আর প্রাণের জোরে যারা শাসন করিল আধা জাহান আজ সেই মাটিতে সৌদিরা পরাধীন।
নামব মিসফালায় নামিয়ে দিল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কাছে!
উল্টোপথে বাসায় গিয়ে উদরে আহার দিতে হল।
তারপর হন্তদন্ত হয়ে মসজিদে হারামে এলাম, মাগরিবের আগে কষ্টেমষ্টে তাওয়াফ শেষ করে বসলাম।
অভ্যাসমত ডান পাশের জনকে জিজ্ঞেস করলাম দেশ?
ইন্দোনেশিয়া।
আমার?
বাংলাদেশ।
খুব খুশি আমার দাড়ি দেখিয়ে বলল সুন্দর। বললাম, তুমি রাখ না কেন? চওড়া হাসি দিয়ে একটা সেলফি নিল।
রাস্তায় হাটা চলায় অনেক খেয়াল করতে হয়।
এক ওমরায় অনেক কিছুর দিকে খেয়াল যায়,
আল্লাহর ঘরে আগত মেহমানদের প্রায় সবাই মোটাসোটা যুদ্ধ করতে অক্ষম।
বিলাসিতা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়েছেএজন্য গত কয়েকশো বছর ইহুদি খৃষ্টানদের হাতে মার খেয়ে বিলীন হওয়া ছাড়া আমরা মুসলমানদের কোন অর্জন নাই।
অবশ্য মার খেতে পারা ও তো বিরাট অর্জন এজন্য তো ফিলিস্তিন কাশ্মীর হওয়া লাগবে।
চারিদিকে তাকানোর মন্দ অভ্যাস যে কবে যাবে?
আফ্রিকার কাউকে দেখলে তারিক বিন জিয়াদের আকাঙ্খা জাগে।মিশরের লোকদের দেখলে সুলতান সালাহউদ্দিন আইয়ুবীর কথা। আমি কি সে স্বপ্ন দেখার ক্বাবিল?
বিজয়ের স্বপ্ন কার না দেখতে ভালো লাগে?
আমি তো বিজিত জাতির এক সন্তান,স্বপ্ন দেখা কি দোষের?
এদেশের আর্মিরা ইংরেজির চেয়ে উর্দুটা বেশী রপ্ত করেছে বলে মনে হচ্ছে। কিছু কিছু উচ্চারণে হাসিও পায়।
ভাষা বড় মজার একটা গেইম।ভিনদেশীদের মুখে যা শুধু হাসিই জোগাড় করে দেয়।
মাগরিবের পর সাঈ শেষ করলাম এশা পড়ে বাসার পথে আসতে আসতে রাত ১০ টা বেজে গেল।
ভাগ্যিস পা কে দুনিয়ায় কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়নি।

0 মন্তব্য রয়েছে