সৌদি আরবে 14 দিন

সৌদি আরবে 14 দিন

3য় কিস্তি

ফজরে কাঙ্খিত সময়ে উঠতে দেরি হয়ে গেল,সাথীদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হেরেমের সাথে লাগোয়া ৬ নং  ওয়াশব্লকের  নিকট এলাম  সঙ্গীদের নামাজের কাতারে বসিয়ে রেখে আমি ওয়াশরুমে গেলাম ( এখানকার ওয়াশব্লক আন্ডারগ্রাউন্ডে দুইতলা সমান নিচে তৈরী করা) ফজরের জামাতে শরীক হয়ে এক রাকাত ভাগে পেলাম।মনে মনে বললাম,পেটের জ্বালা না থাকলে কতইনা ভালো হত রে আইয়ুব!

শরীরে যথেষ্ট এনার্জি থাকলেও তাওয়াফ না করে  নামাজ শেষে হোটেলে চলে এলাম। সাথীদের নিয়ে আজ তায়েফ যাওয়ার কথা আছে।বিগত সফরে আমি তায়েফ ঘুরেছি  তাই মনে মনে ভিন্ন পরিকল্পনা আঁটলাম।পবিত্র এ জমিনে সময়ের সদ্ব্যবহার না করলে মরণ।

সাথী ভাইদের তায়েফ পাঠিয়ে আমি একা একা চলে গেলাম স্বপ্নের পাহাড় জাবালে নূরে ;যেখানে রাসূল সাঃ মাসের পর মাস কাবার দিকে মুখ করে মুরাকবা করতেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে বহুল প্রতিক্ষীত ওহী এখানে অবতীর্ণ হয়েছিল।

মিসফালা পেরিয়ে হযরত ওমর ফারুক টানেলের উপর এসে বাহন তালাশ, অপেক্ষা, দরদাম কষাকষির পর গাড়িতে চড়লাম। গাড়িওয়ালা কাশ্মীরী, তাই সাবলীলভাবে কথা চালিয়ে গেলাম। ভদ্রলোক ড্রাইভার দুই মাস হল বাড়ি থেকে আসছে,মোদীর যন্ত্রণায় অস্থির। আইনের পর আইন আর ধরপাকড়, গোলাগুলি হত্যা এগুলো তো কাশ্মীরেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে জানাল,কাশ্মীরের এক অংশ ভারতে আরেক অংশ চীনে কিছু  অংশ পাকিস্থান।

ও বলল,চীনের অংশ পাহাড়। সবচেয়ে সুন্দর ভারতের অংশ তবে মোদি সে অংশকে  অস্থির রেখেছে ক্ষমতার বাগডোর হাতে নিয়ে।ঘড়ির কাটায় তখন সকাল ৮ঃ২৫,বেশ বেলা হয়ে গেছে, রোদের তাপ প্রখর। হিম্মত করে পাহাড়ে চড়া শুরু করলাম। ঘড়ির কাটায় তখন সাকল ৮ঃ৩৫।কিন্তু রোদের তাপে মনে হবে বাংলাদেশের দুপুর ১২টা

উপরে উঠতে পাক্কা এক ঘন্টা লেগে গেল। মাঝখানে ৫ জায়গায় জিড়িয়ে নিলাম। পাহাড়ের বিভিন্ন খাদে  পাকিস্তানিরা শরবত পানি ও বিভিন্ন জিনিস বিক্রি করছে।পাহাড়ে যারা চড়ছে তারা পাকিস্তানি  ইন্ডিয়ান ও বাংলাদেশী বেশী বুঝা যায় এ অঞ্চলের মানুষের সাথে ইতিহাস ও এই পাহাড়ের সম্পর্ক বেশী।

এক জায়গায় তাবুর মত বানানো। ভিতরে ঢুকে দেখি ঠান্ডা বাতাস, ঠান্ডা পানি,সোফা, ফ্রী ছাতা বিতরণ সবই আছে।এক  শায়খ এই জাবালে নূরের ইতিহাস ঐতিহ্য মূল্য সবকিছু বুঝাচ্ছেন বিশুদ্ধ আরবীতে তবে তিনি আরবি নন এটা স্পষ্ট।

মানুষ হিসেবে এখন শীতলতা দরকার ওটা পূরণ হলেই সালাম।

বিনামূল্যে ছাতা কয়েকটা নিতে চাইলেও লজ্জায় একটা নিয়ে ক্ষ্যান্ত হলাম। ফ্রী পানি নিয়ে বোঝা বাড়ানো বোকামি কারণ পাহাড়ে উঠতে বোঝামুক্ত হতে হবে।তাবু থেকে বেরিয়ে উপরে তাকাতেই বুক ধুকপুক শুরু করল,মনে হয় কেবল স্তর পাড়ি দিয়েছি সামনে আরো ১০ স্তর বাকি অথচ এনার্জি শেষ।

পাহাড়ে নিরাপদে উঠার জন্য সিড়ির মত করা হয়েছে, নিরাপত্তার জন্য সাধ্য অনুযায়ী রেলিং দেওয়া। তারপর ও উঠতে কাহিল কিন্তু মহিলা মানুষ হযরত খাদিজা রাঃ দৈনিক কেমনে উঠতেন, কিভাবে উঠতেন। কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব?

হ্যাঁ,যদি তিনি হযরত খাদিজা হন তাহলে পাহাড় কেন আকাশের চূড়ায় আরোহন ও সম্ভব। পাহাড়ের এই জায়গা থেকে নিচের সুবিশাল অট্টালিকাগুলোও ক্ষুদ্র দেখা যাচ্ছে।

দুই পাহাড়ের মাঝে চাপ দেওয়ার অনুরোধ সেদিন কবুল হলে সত্যিসত্যিই তায়েফবাসী ছাতু হয়ে যেত।কিন্তু সেদিন রহমাতুল্লিল আলামীন সাঃ এর দয়ায় তায়েফবাসী প্রাণে বেঁচেছিল। আর আমরা দক্ষিণ এশিয়াবাসী এই তায়েফের উসিলায় ( মুহাম্মদ বিন কাসিম) ঈমান পেয়েছি, তারমানে নবীজীর দোআর ইঙ্গিত উপমহাদেশবাসী? মাশাআল্লাহ।

একদম চূড়ায় পৌঁছে দম নিলাম, এখান থেকে মক্কা শহরটা সুন্দরভাবে দেখা যায় সুবহানাল্লাহ। উঁচু উঁচু দালান না থাকলে কাবা ঘর স্পষ্টভাবে দেখা যেত।মহানবী সাঃ যে জায়গায় বসে মুরাকাবা করতেন সেখনে  পাকিস্মতানি পুরুষ মহিলার প্রচন্ড ভীড়, সবাই দু রাকাত নামাজ পড়বে।

সে কি গভীর আত্মিক প্রেম ভালোবাসা। জায়গাটায় পৌছতে পাথরের মাঝখান দিয়ে সুড়ঙ্গের মতো পথে কাতকুত হয়ে ভিতরে চলে গেলাম। এখানে যে হৈচৈ তাতে নামাজ পড়ার আশা ক্ষীণ হয়ে এল।ঐখান থেকে আরো উপরে গিয়ে বাইতুল্লাহর দিকে মুখ করে দু'রাকাত নামাজ পড়ি

নীচে নামতে মা খাদিজার জাতী একজনকে ছাতা ধরলাম। বাড়ি আসাম বাংলায় কথা বলতে চায় কিন্তু ভাবল বাংলাদেশের ভাষা উর্দু তাই আমি সাবলীলভাবে উর্দুতে চালিয়ে গেলাম আর সামী স্ত্রী নাকানিচুবানি খেল আমার উর্দুর কাছে।

নিচে নামলাম ১০ঃ৫০ কাচা খেজুর খেলাম এবার হারামে যাওয়ার পালা। কালচারাল সেন্টারের  পরিচ্ছন্নতায় আমার দেশি ভাই। কাচা খেজুরের কাদি অটোমেটিক রেখে  দিচ্ছে আর ইন্দোনেশিয়ার মহিলারা সবাক হয়ে কাড়াকাড়িতে অংশ  নিচ্ছে কি করব কাচা খেজুরের লোভ সামলাতে না পেরে আমিও শরীক হলাম।

মনে মনে ভাবছি,বাঙালিরাই বাঙালীদের ছোটলোক বিশৃঙ্খল বলে তুলোধুনো করে অথচ পৃথিবীর অন্য জাতিরাও থাবাথাবির ভাষা কি দারুণভাবে রপ্ত করেছে এমনকি আমাকেও ছাড়িয়ে গেল!

অভিজ্ঞতাঃ দেশি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম এত কাচা খেজুর কেন ছিড়লে?বলল,খেজুরের বৃদ্ধি পাওয়ার একটা সময় আছে ঐ সময়টা পার হওয়ার পরও যদি খেজুরের গঠন বৃদ্ধি না পায় তখন কেটে ফেলা হয়।

আসছিলাম একা ১০ রিয়ালে যাওয়ার সময় চারজন মিলে ৫ রিয়ালে। এ জন্য কোথও গেলে সাথী সঙ্গী নিয়ে গেলে খরচ কম পড়বে।প্রত্যেক ঐতিহাসিক জায়গার সাথে কালচারাল সেন্টার খুলেছে সাথে আধুনিক বড় বড় স্ক্রীনে সবকিছু  দেখাচ্ছে।  পরিচ্ছন্নতাকর্মী বেশিরভাগ বাঙালি

নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের লোকজন মক্কা শরীফে বেশি দেখলাম।এখানে দেশী শব্দটি বেশ পরিচিত তবে দিনশেষে দেশী পরিচয় থেকে রিয়ালের গুরুত্ব বেশি।হোটেলে এসে গোসল সেরে সোজা হারামে দুই তাওয়াফ করে বাসায় আসতে আড়াইাটা বেজে গেল, খেয়ে কাইলুলা করে  গন্তব্য  মসজিদে আয়েশা।

মিসফালার ওভারব্রিজের নিচে বসলাম একা আসা যাওয়া ৪০ রিয়াল আর চারজন বা ততোধিক গেলে আসা যাওয়া ১০ রিয়াল অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর  পাকিস্তানি এক পরিবারের সাথে বসলাম। আমি পিছে দুই সাইডে নিষ্পাপ দুইজন।আফফানের আম্মুর কিনে দেওয়া চকলেট দিলাম খুব খুশি।সবাই আমরা ইহরামের কাপড় পড়া।দুই  বাচ্চাকে মুয়াওয়াজ ও মুআব্বিজের মত মনে  হচ্ছে।   কিন্তু আমরা মারব কাকে?  শয়তানকে।বাম পাশেরটা একটু দুষ্ট মনে হল।

গোসল করে জামাতে আসর পড়লাম তারপর ওমরাহর ২ রাকাত নামাজ পড়ে বাইতুল্লাহর দিকে রওনা হলাম।এবারের ওমরাহ   হচ্ছে মেরিকা প্রবাসী আমার সুহৃদ জনাব  রুহুল আমিন কাকার মরহুম মা বাবার পক্ষ থেকে।

কিং আব্দুল আজিজ গেট দিয়ে মাতাফে এলাম আসরের পর তাওয়াফ সাঈ দুটোই হল। সবুজ দাগে ছোট্ট  বাচ্চাদের দৌড় সত্যিসত্যিই দেখার মতো খুব আনন্দ নিয়ে দৌড়াচ্ছে  মজা  পাচ্ছে। আমার তিনটা  বাচ্চার কথা মনে পড়ে গেল আফফান সাওবান উনাইসা কবে যে মাতাফে সাফা মারওয়ায় ওদের দৌড়াদৌড়ি দেখব? ইনশাআল্লাহ দেখব ইনশাআল্লাহ। জিলেট রোজারের মাথা নিয়ে আসছিলাম সেটা দিয়ে একাকী ক্ষৌরকার্য সারলাম। বাংলার সেই বিখ্যাত প্রবাদ বুদ্ধি থাকলে ঘর জামাই থাকা লাগে না।কাবা শরীফ সামনে নিয়ে বসে আছি যত দেখি ততই ভালো লাগে কিন্তু  হৃদয়ে এখনো কোন আবেগ আবেদন তৈরী হল না। আল্লাহর ভয় তাঁর ঘরের জালালতে  অন্তরটা কেন কেঁপে উঠে না। মহান ঘর দেখেও দিলটা স্বাভাবিক কেন?

আসলে সবকিছুর সৌন্দর্যের পিছনে পরিশ্রম আছে আরো আছে পরিকল্পনা কিন্তু  আমাদের হৃদয়ের পরিচর্যা ও  সুস্থতার জন্য আসলে কোন পরিকল্পনা পরিচর্যা নেই যে জন্য মৃত সাগরে কোন ঢেউ উঠছে না,  অন্তরের কোন পরিবর্তন নেই ধিক শত ধিক।মাশাআল্লাহ মাগরিবের আযান শুরম্ন হয়েছে তার আগে ডান দিকের এক ভাইয়ের সাথে সবে আলাপচারিতা শুরম্ন হল।

পাঞ্জাব প্রদেশের এক ভাইয়ের সাথে। বললাম, দেশভাগ কেন হল? সোজাসাপটা উত্তর দিলেন শাসকদের অপরাধ।তবে এখন পাকি¯তান নিজের ভুল বুঝে চীনকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশের পাশে  দাড়াচ্ছে।

সাথে সাথে  পাকিস্তান যে মুসলিম বিশ্বের মাঝে একমাত্র পারমানবিক বোমার মালিক সে জন্য তারা খুব উৎফুল্ল। মাগরিবের নামাজ শেষে অনেক কসরত করলাম কিং আব্দুল আজিজ গেইট দিয়ে বের হওয়ার জন্য কিন্তু পারলাম না শেষে ৮ টার আগ ১নাগাদ গেইট খুলল আমিও মসজিদে আয়োশায় গিয়ে এশার নামাজ ধরার জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটলাম কিন্তু  ট্যাক্সি আর পাই না পাক্কা ৪৫ মিনিট ঘুরাঘুরির পর মসজিদে হারামের আজান  শুরু হয়ে গেল তারপর জামাত  শুরু। জামাত ধরার জন্য হাঁটতে হাঁটতে এক রাকাত শেষ হয়ে গেল। নামাজ শেষে হোটেলমুখী হলাম। এই শহর হাঁটার শহর,হাঁটার জন্য হালকা দেহ খুবই উপযোগী। দেহভারী বা বয়স বেড়ে গেলে চলাফেরা কঠিন।খাবারদাবার পর্যাপ্ত কিন্তু প্রয়োজনের বেশী খাওয়া বিপদ ডেকে আনবে।

নামাজের পর পরই ফুটপাতে ভ্রাম্যমাণ দোকান বসে যায়।  স্থায়ী দোকানের তুলনায় জিনিসপত্র সস্তা।জুব্বা, ঘড়ি, রুমাল,খেলনা,পারফিউম, আতর,তাসবিহ,সুরমা,হিজাব এগুলো অহরহ পাওয়া যায়।

বিক্রেতারা বেশিরভাগ নিগ্রো, সুদানি,দীর্ঘদেহী। এখন ক্লিয়ার হয়েছেতারিক বিন যিয়াদ বা ইউসুফ বিন তাশফিনের নাম শুনতেই শয়তান রডারিকদের আত্মা কেন শুকিয়ে যেত?বলদিয়া নামে স্পেশাল এক জাতি আছে যাদের দেখলে এই নিগ্রোরাও দৌড়ে পালায়।এখন দেখছি দুই চারজন বাঙালি ভাইও আছে।

দোকানগুলোতে হ্যান্ডমাইক রেকর্ড চালু আছে। হারমাল দু রিয়াল,ইবাদাতের পাশাপাশি পরিবার পরিজন আপন জনের জন্যও বিপুল কেনাকাটা চলে এখানে।

মসজিদে হারামে যারা শ্রমিক তারা দেখলাম যথেষ্ট  গুরুত্বের সাথে নামাজ পড়ছে মোয়েটার জন্য কানের দুল কিনতে স্বর্ণের দোকানে ঢুকলাম ; ভদ্রলোক ইয়েমেনী আমার দেশের পরিচয় জেনে বলল,হাসিনা মোদি? সব খারাপ সব খারাপ ইউনুস ভালো অবাক হলাম এরাও দেশ বিদেশের খবর রাখে তাহলে?এবার আমি বললাম, মুহাম্মাদ বিন সালমান কেমন?  বলল শতগুণ ভালো।

বললাম  ফিলিস্তিনের জন্য কি করছে?ঘুরেফিরে একই কথা শতভাগ ভালো। বললাম, ইয়েমেনের কি  অবস্থা , হুতি? বলল,ওরা সবাই মোদি! বললাম, ইরান ও কি মোদি? পাশ থেকে আরেকজন বলল,রাজনীতির আলাপ বন্ধ এটা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

বাইরে চলে এলাম রেস্ট নিয়ে রাত দুইটায় উঠতে হবে আল্লাহুম্মা বিসমিকা আমুতু ওয়া আহইয়া।

 

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ