মিযাজে শরীআত

বুক রিভিউ

মিযাজে শরীআত

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ

বইটা শেষ করে মুখ দিয়ে বারবার বের হচ্ছিল, ইয়া শায়খ! ফিদাকা আবি ওয়া উম্মি।

ভদ্র ভাষায় নম্রতা শালীনতা ও ভাবগাম্ভীর্যের সীমায় নিজেকে আবদ্ধ রেখে লেখক ইসলামকে বিশ্লেষণ করছেন নির্মোহ দৃষ্টিতে।

লেখক তাঁর সারা জীবনের সঞ্চিত মুক্তা সুনিপুণভাবে

গেঁথে দিয়েছেন "মিযাজে শরীআত" নামক মূল্যবান গ্রন্থে।

পাঠক! চলুন ঘুরে আসি নতুন এক স্বপ্নিল দিগন্ত থেকে।

কেবল ফিতরাত বা স্বভাবকে মিযাজ বলা যায় না। ভাব ও ফিতরাত আলাদা বিষয়। এভাবে বইয়ের সূচনা।

ধীরে ধীরে মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, জানার অপরিপক্বতা,মেধার সংকোচন থেকে মহাবিশ্বের একক সৃষ্টা মহান আল্লাহর সৃষ্টি, চয়ন দ্বীনে ইসলামের চাহিদা ইত্যাদি আলোচিত হয়েছে যুক্তি জ্ঞান ও আকলের সংজ্ঞায়।

এই বই পড়ে আধুনিক বিশ্বের মানবসৃষ্ট মতবাদ দ্বন্দ্ব ও মনুষ্য সৃষ্ট সমস্যা এক ছাদের নিচে পাওয়া যাবে।

৫১ পৃষ্ঠা থেকে মিযাজে শরীআতের যৌক্তিক হিকমা ও রহস্য নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

তার আগে ১৫-৫০ নং পৃষ্ঠা পর্যন্ত আলোচ্য বিষয়ের ভূমিকা ধরা যায়। তারপর ১৯০ তথা শেষ পর্যন্ত আলোচিত হয়েছে দীনে ইসলামের সকল দিক সব আলোচনা।

যথাঃ তাওহিদ রেসালাত আখিরাত,সাহাবায়ে কেরাম,খতমে নবুওয়াত,বিদআত,দাওয়াত তাযকিয়া,জিহাদ ও কিতাল,তাকওয়া ও ইনসাফ,রুখসত ও আযীমাত,হালাল ও হারাম,কিতাবুল্লাহ ও রিজালুল্লাহ তওবা ও ইস্তিগফার দোআ।

পাঠক! শিরোনাম পড়ে সব গুলিয়ে ফেলবেন না, মনে করবেন না, আরে লেখক সাহেব আমাদের জানা বিষয়ই আলোচনা করেছেন, চর্বিত চর্বন মনে হয়।

না না খবরদার, মারাত্মক ভুল করবেন যদি এমনটা ভেবে থাকেন।

তিনি বরং আমাদের জানা বিষয়ের আবেদন ও মিযাজ নিয়ে আমাদের ধারণার ও অনেক উর্ধ্বে নিয়ে গেছেন বড্ড মমতায় কুরআন ও সুন্নাহর প্রলেপে।

প্রথমে কুরআন সুন্নাহর দলিলসহ মিযাজে শরীআতের কতিপয় দিক যেমনঃ

ক.তওহীদে মতলক,নির্ভেজাল ও নিরেট তওহীদে বিশ্বাস

খ.তওহীদ ফিয্-যাত বা আল্লাহর সত্তায় একত্বের বিশ্বাস

গ.তওহীদ ফিস্-সিফাত,গুণাবলীর ক্ষেত্রে তওহীদের বিশ্বাস

ঘ. তওহীদ ফিল আফআল,তাঁর ক্রিয়াকর্মেও তওহীদের বিশ্বাস

ঙ. তওহীদ ফিল হুক্ ম, একমাত্র বিধানদাতা হওয়ার ক্ষেত্রেও তাওহীদ

এভাবে ধীরে ধীরে ইসলাম ও মিযাজে শরীআতের গভীর সমুদ্রে ডুব।

★মনোরম শব্দ চয়ন

সাহিত্যরস যে কোন লেখাকে পূর্ণতায় নিয়ে যায়,আগ্রহী পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে সসের কাজ দেয়।

লেখক মহোদয় মিযাজে শরীআতে অত্যন্ত মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন।

বইয়ের ভাজে ভাজে যেন মুক্তোঝরিয়েছেন।

যেমনঃ

মাৎসর্য্য,বোধনীয়,বিন্দুপট,জট-জটিল। সীমান্ত বদরী বৃক্ষধাম ( সিদরাতুল মুনতাহা) একমেবাদ্বিতীয়ম, সুবাসিত মদির গন্ধামোদিত নির্মল বাতাস,ভৈরবী নাদ,রঙ নেহারিত,ইথার তরঙ্গ, অন্তারালোকে বিক্ষণ করা, ভালোবাসার দ্যোতনায় ব্যঞ্জনাময়, রিয়া বা লোকরঞ্জন অভিলাষ,বিমলিন আবহে উছল হয়, মেঘবিস্তারি অবারিত করুণা, বাধ্যকর্তা,শান্তিবাদী সহ-অবস্থান, ঔৎসুক্য নিবারণ, জনপদবধূ ( বেশ্যা), সাধনার উল্লম্ফন, সমীপবর্তী, প্রেমময় সঞ্জাত,সত্যম উদ্দীপম,

পাঠক! মাত্র কয়েকটা শব্দ বুঝার জন্য দিলাম আর পুরোটা বই পড়লে আপনি অবশ্যই মৃদু মৃদু ঝাঁকুনি খাবেন পাঠের পরতে পরতে।

★যা কিছু দারুণ লেগেছে)

মানবমেধার ব্যর্থতার পরিচয় দিতে গিয়ে যা লিখেছেন সেখানে উদাহরণ দিতে গিয়ে বলেছেন, "মাছালতু মাছালান" বাংলা ভাষায় যা খুব ইন্টারেস্টিং।

(মানবমস্তিস্ক) সৃষ্টিকেই বুঝেনি, মিজায ও বৈশিষ্ট্য কি বুঝবে!

" চরম সত্য ও ইসলাম একই জিনিস"

জিহাদ ও কিতালের অধ্যায়ে ইসলামের মিযাজ দারুণভাবে ভারসাম্যতায় পূর্ণ করে তুলেছেন।

হজ্জের মিযাজ ও আজীমত নিয়ে যে ভাষা শৈলী ও আবেদন উপস্থাপন করেছেন এক কথায় মোহনীয় এবং আরো কত কি!

★আল কুরআনের

পাঠক মহোদয়ের নৈকট্যশীল যারা তাঁরা জানেন যে,কুরআনের সাথে তাঁর কি গভীর মিতালী। কুরআনের সাগরে বহু বছর ধরে ডুবে আছেন আসমানী রঙে রঙীন হয়ে

পাঠক!মিযাজে শরীআত পড়ে লেখকের এই গুণটা বারবার ধরা দিবে।

কিছু উদাহরণ উপস্থাপনের লোভ সামলে রাখতে পারছি না।

انه كان ظلوما جهولا

যালূম' বড়ই সীমাতিক্রমকারী জাহুল' নিতান্ত অজ্ঞ'

و تعزروه و توقروه

শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচার মন্ডিত ভালোবাসাকে কুরআন মাজীদ ' তা'যীর' ও 'তাওকীর' শব্দে বিম্বিত করা হয়েছে।

★ইতিহাস চর্চিত হয়েছে

মাঝে মাঝে প্রয়োজনের তাগিদে কিছু মনে রাখার মতো ইতিহাসের চিত্রায়ণ করেছেন।

যেমনঃ

১)মুসলিম বিশ্বের প্রথম প্রধান বিচারপতি ইমাম আবূ ইউসুফ রহঃ

২) হযরত উছমান রাঃ সমগ্র মদীনাবাসীর জন্য পানির ব্যবস্থা করেছিলেন কিন্তু শাহাদাতের সময় নিজে পানির জন্য তড়পাচ্ছিলেন।

তারমানে নিজের সম্পদ মুসলিমদের কল্যানে ব্যয় করেছিলেন কিন্তু নিজের বেলায় কৃচ্ছ ছিলেন।

★ দারুণ তথ্য ও তত্ত্ব

মিযাজে শরীআত পড়বেন অথচ তথ্য পাবেন না তা কি করে হয়?

১) খন্ডিত সত্তা হিসেবে নয় মানুষকে দেখতে হবে সামগ্রিকতার দৃষ্টিতে

২) আধুনিক মতাদর্শগুলো মানুষকে চিনতে ভুল করেছে নিদারুণভাবে।

৩) বর্তমানে যেসব মতাদর্শ সবচেয়ে বেশি ঢেউ তুলেছে, এগুলোর মাঝে তিনটি হলো প্রধান, ডারউইনের বিবর্তনবাদ,মাক্সের অর্থনৈতিক সাম্যবাদ আর ফ্রয়েডের যৌনবাদ।

৪) মানব জীবনের দুটি সম্পর্ক ১ম টি আল্লাহর সাথে আবদিয়্যাত ২য়টি মাখলুকের সঙ্গে খেলাফত বান্দা হয়ে আল্লাহর খলিফা।

৫) মানবজীবনচক্রের তিনটি স্তরবৈচিত্র মাতৃজঠর জগত,ইহজগত, পারলৌকিক জগত।

৬) হযরত আদম আঃ এর সৃষ্টির পর আল্লাহ পাক ফেরেশতাদের জ্ঞানের পরীক্ষা নিয়েছিলেন। এবং আদম আঃ এর স্তরে ফেরেশতারা পৌঁছাতে না পারায় সেজদার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

৭) জ্ঞান অর্জনের স্তর ➤উইজদান➤পন্চ ইন্দ্রীয়➤অভিজ্ঞতা➤আকল➤ ওহী

৮) খালিস ও মুতলক তওহীদ, নিরেট নির্ভেজাল একত্ববাদই ছিল সব আসমানী দীন ও জীবনব্যবস্থাসমূহের মূল বুনিয়াদ।

৯) আনুগত্য বিনে ভালোবাসার নাম ভালোবাসা নয়, চাটুকারিতা, মুনাফিকী।

১০) দাওয়াত হল স্রোতস্বিনী নদীর মতো।নিরবচ্ছিন্ন স্রোতের টানে সব আবর্জনা ভেসে যায়।নদীর পানি থাকে টলটলে পরিষ্কার।

১১) মুমিনকে মোটাদাগে ১০ টি কুরিপুর বিরুদ্ধে জিহাদ করতে হয় যথাঃ

১) লোভ২) দীর্ঘ আশা৩) ক্রোধ ৪) মিথ্যাচার ৫) গীবত ৬) কৃপণতা ৭) হিংসা ৮) রিয়া বা লোকদেখানো ৯) অহংকার ১০) বিদ্বেষ

এবং ১০ টি গুণ অর্জন করতে লড়াই করতে হয়

১) ধৈর্য্য ২)সহিষ্ণুতা ৩ ) শোকরগুজার ৪)অল্পে তুষ্টি ৫) ইলম বা ঐশীজ্ঞান ৬) ইয়াকিন ৭) আল্লাহর উপর নিজেকে পরিপূর্ণ সমর্পণ ৮)তাওয়াক্কুল ৯) আল্লাহর সন্তুষ্টি ১০) তাসলীম বা অনন্ত সমর্পণ

১২) তাকওয়ার স্তর ৩টি

১.সকল ধরনের কুফরী-শিরকী ও ইসলাম বিরোধী আকীদা বিশ্বাস থেকে নিজেকে রক্ষা করা।

২. হারাম ও অবৈধ বিষয়সমূহ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা।

৩. সবধরনের 'গাইরুল্লাহ' আল্লাহ ছাড়া বাকী সবকিছু থেকে আত্মরক্ষা করা।

১৩) এক সাহাবীর ব্যাপারে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৩ বার বললেন, সে জান্নাতি।

আরেক সাহাবী তাঁর আমল দেখতে ৩ দিন তার সাথে লেগে থাকলেন কিন্তু বিশেষ কিছু দেখলেন না,শেষে প্রশ্ন করে বসলেন কি এমন আমল করেন?

উত্তরে তিনি বললেন, পৃথিবীর কারো ক্ষেত্রে আমার মাঝে কোন অমঙ্গ চিন্তা নেই।

১৪.শিরক হলো মানববিকাশ,মানবিকতা, মানুষের আত্মার চাহিদার উপর সবচে' বড় জুলুম,সবচে' বড় অনাচার।

১৫.আজকের পৃথিবীর বিজ্ঞান ও দর্শনচিন্তার সবচে' বড় ভুল হল,সে তার সীমাবদ্ধতা দিয়ে অসীমতাকে মাপতে চায়,ত্রুটিপূর্ণ সংশয়বিদ্ধ অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান দিয়ে সংশয়াতীত, ইন্দ্রিয়াতীত বিষয়ের নিরীক্ষা করতে অভিলাষী। নিজের অক্ষমতা দিয়ে অননুমেয় বিষয়ে নাক গলানোর অনধিকার চর্চায় লিপ্ত হতে আগ্রাসী।

সুতরাং বিভ্রান্তির মহা গোলকধাঁধায় চরকি ঘূর্ণন ছাড়া আর কিছুই করার নেই তার,মহাসত্যের সমীপবর্তী হওয়ারও পথ নেই তার।

★বইটি কারা পড়বেন?

কথায় কথায় অনেক কথা ই হল,এখন আসি মূল কথায়,বইটি কারা পড়বেন?

প্রত্যেক মুসলমান পড়বেন নাপড়তে পারলে যে পারে তার থেকে শুনবেন। কিন্তু জানা দরকার

তারপর সকল আলেম উলামা,ইমাম দাঈ খতীব,শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কলাকুশলীরা।

তাহলে সঠিক সত্য নিরেট ইসলামের আহবান জানতে ও বুঝতে পারবেন।

★বই সম্পর্কে

তাহলে বই সম্পর্কে কিছু সারকথা বলে ফেলি।

এক কথায় দীনে ইসলামের মেজায, রুচি,চাহিদা,আহবান ইতিহাসের নিরিখে কুরআন সুন্নাহর নিক্তিতে পাই টু পাই মেপে মেপে পরম মমতায় সাজিয়েছেন।

তাওহিদ, রিসালাত,আখেরাতে সফলতার পথ ও পাথেয় যেভাবে উপস্থাপন করেছেন তেমনি ব্যর্থতার উপকরণ, ইসলামের নামে ভ্রান্ত মতবাদ অপনোদন করেছেন কুরআন সুন্নাহর আলোকে

ইহুদি থেকে খৃষ্টান, নাস্তিক থেকে যিন্দিক,ধর্মের নামে শিয়া,রাফেজি,বেদআতি,কাদিয়ানী, মওদুদী,আহলে কুরআন, আহলে হাদিস সবাইকে তাদের নিজ নিজ ভুলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে, তওবা করে ফিরে আসার পথে বাতলে দেওয়া হয়েছে।

বইটি প্রকাশ করেছে বরাবরের মতো পাথেয় পাবলিকেশন্স।

প্রচ্ছদ, ইনার,সজ্জা,বাঁধাই, কালার চয়ন,পৃষ্ঠার মান আঙ্গিক এক কথায় শতভাগ পাঠক নন্দিত, প্রশংসনীয়। কারণ উস্তাযে মুহতারাম মুফতি সদরুদ্দীন মাকনুন সাহেব ও মুফতি যারওয়াতুদ্দীন সামনূন সাহেব অনন্য রুচি বৈচিত্র্য ও আন্তর্জাতিক মানের ভাষা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করেছেন মাশাআল্লাহ। বই হিসেবে

মুদ্রিত মূল্য রাখা হয়েছে মাত্র দুইশো টাকা।

★লেখক সম্পর্কে

বুক রিভিউয়ের শেষ ও আসল চ্যাপ্টার এটি।

বইটা পড়ার সময় বারবার লেখক মহোদয়কে স্মৃতিতে তাজা করতে চাচ্ছিলাম।

সুবিস্তৃত পড়াশোনা ছাড়া এমন গ্রন্থ রচনা অসম্ভব।

তিনি আরবি ভাষার সাথে বাংলাকে দারুণভাবে মিলাতে পারেন, যেমন দেখুন,"মূলত দীনের ইকমাল ও ইতমাম, পরিপূর্ণতা ও পরিসমাপ্তির"

শায়খের সাহিত্য সম্ভারে ডুব দিয়ে আমি হাবুডুবু খাচ্ছিলাম।

কুরআন হাদিসের প্রচুর নুসুস আনা হয়েছে এই গ্রন্থে।

কি উচ্চমার্গের শব্দচয়ন রে বাবা।

ইসলামের সামগ্রিক দিক মুনশিয়ানা কায়দায় তুলে ধরেছেন লেখক আমি যারপরনাই বিস্মিত হতভম্ব।

মিযাজে শরীআত সত্য ধর্ম ইসলামের উপর একটি পূর্ণাঙ্গ ও মৌলিক গ্রন্থ মনে হয়েছে।

লেখক সম্পর্কে কবি চিন্তক ও দীনের মহান দাঈ মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান সাহেবের একটা পংক্তি দিয়ে লেখক সম্পর্কে ইতি টানছি,

"সহস্র বছর বাঙালির তপস্যায়

একজন ফরীদ মাসউদ জন্মায়"

মুহাম্মাদ আইয়ুব

২১-১১-২৫ শুক্রবার রাত ০৮-৫৪ মিনিট

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ