বুক রিভিউ  ম্যলকম এক্স নির্বাচিত ভাষণ

বুক রিভিউ

ম্যলকম এক্স নির্বাচিত ভাষণ

ম্যলকম এক্সের নাম সারাজীবনে কয়েকবার মনে হয় শুনেছি।

মাস সাতেক আগে প্রজন্ম পাবলিকেশন্স থেকে কয়েকটা বই কিনেছিলাম তার মধ্যে মিস্টার ম্যালকম এক্সের নির্বাচিত ভাষণ ও ছিল।

একজন অমুসলিমের বই আর আমাকে কতটা আলোড়িত করবে তারপর ও দেখি আজাদীর লড়াইটা কেমন এমন ভাবনা থেকেই বই পড়তে বসলাম।

ও মা! ম্যালকম যে শ্রেষ্ঠ ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছেন বই হাতে নিয়ে জানলাম।

ম্যালকম এক্সের নির্বাচিত ভাষণ আমাকে ভেতর থেকে নাড়া দিয়েছে।

তাঁর দেখানো পদ্ধতি যে কোন দলিত মথিত নির্যাতিত নিষ্পেষিত জাতিকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে।

★যেমন ছিলেন ম্যালকম এক্স

বইয়ের প্রথম পাঠ ম্যালকম লিটলের পরিচিতি।

১৯২৫ সালের ১৯ মে আমেরিকার নেব্রাস্কার ওমাহা শহরে জন্ম। ৬ বছরে সড়ক দূর্ঘটনায় বাবা আর্ল লিটলের মৃত্যু। মায়ের পাগলাগারদে থাকার সময় অনাথ আশ্রমে বেড়ে ওঠা।

তুখোড় ছাত্র ম্যালকম কিন্তু আমেরিকান সমাজের কৃষ্ণাঙ্গ তাচ্ছিল্য দর্শন তাকে স্কুল ছাড়তে বাধ্য করে।

কাহিনী কি?

একদিন ক্লাসে তাঁর শিক্ষক জিজ্ঞেস করেছিলেন,বড় হয়ে কি হতে চাও?

ম্যালকমঃ আইনজীবী হতে চাই।

শিক্ষকঃ মনে রেখ-তুমি কালো।

কালোদের এত বড় উচ্চাশা থাকতে নেই।

ব্যস,এই উত্তর শুনে স্কুল ছেড়ে ১৪ বছর বয়সে বোস্টনে চলে আসেন,জড়িয়ে পড়েন বৈধ অবৈধ কাজে,চুরি ডাকাতি এখানেই শেখা।

১৯৪৬ সনে কোন এক অপরাধে ধরা খেয়ে ১০ বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড পেয়ে কারাগারে যান।

কারাগারের একাকীত্ব আবার তাঁকে ভাবিয়ে তোলে,বইয়ের পাতায় ডুব দেন।

ইতিহাস, রাজনীতি ও দর্শন নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন।

১৯৫২ সালে মুক্তি পান।বলা যায় কারাগারই ছিল ম্যালকম এক্সের মূল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

★ইসলাম গ্রহণ

গোড়া খৃষ্টান পরিবারে বেড়ে ওঠা ম্যালকম কারাগারেই ন্যাশন অব ইসলামে আকৃষ্ট হন। এর প্রধান এলিজা মুহাম্মাদের এর কাছে মনের প্রশ্ন তুলে ধরেন এবং তাঁর সুন্দর যুক্তিপূর্ণ উত্তর পেয়ে কারাগারেই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।

নিজের নাম ম্যালকম লিটল বাদ দিয়ে ম্যালকম এক্স পরিচয় করাতে শুরু করেন।

এক্স মানে প্রকৃত আফ্রিকান পূর্বপুরুষদের বুঝিয়েছেন যারা বাস্তুচ্যুত ও দাস হয়ে শ্বেতাঙ্গদের দেওয়া পদবী গ্রহণে বাধ্য হয়েছিলেন।

অবশ্য ইসলাম গ্রহণের পর তাঁর নাম হয় মালিক আল শাহবাজ।

★বর্ণবাদের বিরুদ্ধে লড়াই

তাঁর জন্ম হয়েছিল বর্ণবাদের কফিনে পেরেক ঠুকে দেওয়ার জন্য।

তাঁর ভাষণগুলো পড়ে আমার ভিতরেই হৈচৈ বেধে গেছে। আত্ম পরিচয়ে ধুঁকতে থাকা যে কোন জাতির জন্য ম্যালকম আজো দারুণ নিয়ামক।

ইসলাম গ্রহণের পর এলিজা মুহাম্মাদের সাথে ঘনিষ্ঠতা, কর্মদক্ষতা তাকে পৌঁছে দিয়েছিল জনপ্রিয়তার সুউচ্চ শিখরে।

৬ ফুট ২ ইঞ্চির সুদর্শন ম্যালকমের বাচনভঙ্গি, প্রত্যয়,গলার স্বরে অপরিমেয় সাহস আর উদ্যম যে কাউকে মুগ্ধ করবে;এবং করেছেও। ন্যাশন অব ইসলামে তাঁর যোগ দেওয়ার পর আফ্রো-আমেরিকান ন্যাশনে যোগ দেওয়া মানুষের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকা এর শক্ত প্রমাণ।

ম্যালকম এক্সের জীবনে অনেকগুলো বাঁক রয়েছে যেগুলোর সবশেষ এলিজা মুহাম্মাদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ, ন্যাশন অব ইসলাম থেকে পদত্যাগ, মক্কায় গিয়ে হজ্ব পালন।

এরপর জীবনের পরতে পরতে অনেকগুলো শত্রু জন্ম নেয় যেমনঃ শ্বেতাঙ্গবিরোধী ক্ষুরধার বক্তৃতার কারণে সরকার ক্ষুদ্ধ, এফবিআইয়ের কুদৃষ্টি, ন্যাশন অব ইসলামের বিভ্রান্ত কর্মী ও ইহুদিরা।

নানামুখী টার্গেট, হুমকির পর কিছুদিনের জন্য নিজেকে গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন কিন্তু যার ধমনীতে বিপ্লবী রক্ত তিনি কি আর সহজে দমে যাবেন?

১৯৬৫ সনের ২১ ফেব্রুয়ারী নিউ ইয়র্ক শহরের ম্যানহাটন অডুবন বলরুমে বক্তৃতা দানের জন্য উঠে দাঁড়ান। ৪০০ অতিথির মাঝে হঠাৎ এক শয়তান নিগা বলে চিৎকার করে উঠে,হৈচৈ বেঁধে যায়।

ম্যালকম ও দেহরক্ষীরা পরিস্থিতি শান্ত করতে এগিয়ে এলে ভীড় থেকে এক ব্যক্তি ম্যালকমের বুক বরাবর গুলি করে।আরো দুই ব্যক্তি কিলিংয়ে অংশ নেয়।

সর্বমোট ২১ টি গুলি করা হয়। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে শাহাদাতের অমীয় সূধা পান করেন ম্যালকম এক্স মালিক আল শাহবাজ।

★বই সম্পর্কে

২১৭ পৃষ্ঠার বইয়ে মোট ভাষণ ১৪ টি যার প্রথমটি " তৃণমূলের প্রতি বার্তা" আর শেষটি হচ্ছে, "বোমা বর্ষণের পর" শেষে কয়েকটি সাক্ষাৎকার আছে।

মুহসিন আব্দুল্লাহর অনুবাদ পড়ে মনে হল, আমি মূল বই পড়ছি কোথাও কোন অসংগতি নজরে আসেনি।

প্রতি লাইনে লাইনে মনে হয়েছে বিপ্লবীদের এমন চেতনা ধারণ ছাড়া লক্ষ্যে পৌঁছা অসম্ভব।

ভাষণের মাঝে চরমপন্থা নেই সে কথা আমি বলব না তবে সাংবাদিকদের প্রশ্নে সেটাও বিধৃত হয়েছে পরম বুদ্ধিমত্তার সাথে তবে আপোষ নামের কোন শব্দ ম্যালকমের অভিধানে ছিল না।

বইটির মূল পতিপাদ্য আমেরিকান সমাজের বর্ণবাদ নির্মূল আন্দোলন।

★ ভাষণ রূপে আগুনের গোলা

তৃণমূলের প্রতি বার্তা।

এলিজা মুহাম্মাদের দল ত্যাগের আগে দলের হয়ে এটা শেষ বক্তৃতা যার শ্রোতা সবাই নিগ্রো অমুসলিম ছিল।

কৃষ্ণাঙ্গদের রক্তে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার কাজটি অনায়াসে তিনি করতেন। ২০২৫ সালে এসেও আমরা দেখি আমেরিকান সমাজে কালো হওয়া মারাত্মক অপরাধ।

কিন্তু ম্যালকমের বয়ান বা মতাদর্শ গ্রহণ করে মুসলিম দেশের সংখ্যালঘুরা যদি তোপ দাগায় দেশের সংখ্যাগরিষ্ট মুসলমানদের বিরুদ্ধে তাহলে সেটা হবে মারাত্মক অন্যায় ও ভুল।

ম্যালকমের ইতিহাস বিষয়ে জ্ঞান ছিল প্রশংসা করার মতো।সারা বিশ্বের ইতিহাস তিনি চষে বেড়িয়েছিলেন।

পাঠক! চলুন, ম্যালকমের বক্তৃতায় নিয়ে যাই।

"আপনারা জানেন না বিপ্লব কি? কারণ,যখন আপনি বুঝলেন ব্যাপারটা কী, এরপর মুখ ফিরিয়ে নিলেন;কার্যত আপনি পথ থেকে সরে গেলেন।

আপনি এমন কোনো বিপ্লব পাবেন না, যেখানে রক্তপাত হয়নি।অথচ আপনি রক্ত ঝরাতে ভয় পান।

যখন সাদারা আপনাদের কালোদের কোরিয়া যুদ্ধে পাঠায়,তখন আপনারা রক্ত ঝরান। রাস্ট্র আপনাকে জার্মানিতে পাঠায়, আপনি রক্ত ঝরান। আপনি সাদাদের জন্য রক্ত ঝরান কিন্তু যখন আপনার সমাজ আক্রান্ত হয়,চার্চগুলো বোমায় ক্ষত বিক্ষত হয়, ছোট শিশুদের হত্যা করা হয়, তখন আপনার গায়ে রক্ত থাকে না।আপনি তখনই রক্ত ঝরান যখন সাদারা রক্ত ঝরাতে বলে।আপনি তখনই কামড় দেন যখন সাদারা কামড় দিতে বলে। আপনি তখনই ঘেউঘেউ করেন যখন সাদারা আপনাদের ঘেউঘেউ করতে বলে।

কি অবিশ্বাস্য শব্দচয়ন রে বাবা। এসব শুনে কেউ ঘুমিয়ে থাকতে পারে? আজকের গণতন্ত্রধারীদের অবস্থা কি এর থেকে ভিন্ন। কক্ষনো নয়।

এ বক্তৃতায় "আঙ্কেল টম"শব্দ যেমন হাসিয়েছে তেমন ভাবিয়েছে। মানে চামচা, মুনাফেক।উচ্ছিষ্টভোগী।

নিগ্রোদের তিনি দুইভাগ করেছেন,

১)হাউজ নিগ্রো২) ফিল্ড নিগ্রো

হাউজ নিগ্রো হচ্ছে উচ্ছিষ্টভোগী,সুবিধাবাদী

আর ফিল্ড নিগ্রো হচ্ছে, নির্যাতিত বিপ্লবী।

অবশ্য এই দুই শ্রেণি সবকালে সবখানে ছিল।

তিনি ভাষণে বলেছেন, আমাদের সকল পড়াশোনার মাঝে ইতিহাস অধ্যয়ন গবেষণার জন্য সবচেয়ে বেশি উপকারী। আপনি যখন সমস্যায় পড়বেন,তখন আপনার করণীয় হলো-বিশ্বের যে জনপদের মানুষেরা আপনার মতো সমস্যায় পড়েছিল, তখন তারা যে কর্মপন্থা অবলম্বন করেছিল তার অনুসরণ করা। দারুণ ফর্মুলা।

★বিপ্লব নিয়ে বিপ্লব

বিপ্লব খুনরাঙা,বিপ্লব দ্রোহ জাগানিয়া। বিপ্লব আপোষ করতে জানে না।বিপ্লব তার গতি পথে বাঁধা হতে আসা সবকিছু উপড়ে ফেলে, ধ্বংস করে দেয়।আর আপনি দেওয়ালের আংটার মতো তার সাথে একাকার হয়ে থাকবেনআর বলবেন " আমি তাদের ভালোবাসি, তারা আমায় যতই ঘৃণা করুক।" না,আপনাকে বিপ্লব বুঝতে হবে।

মিস্টার ম্যালকম এভাবে তাঁর প্রতিটি বক্তৃতায় নিগ্রোদের বিপ্লবের শিক্ষা হাতেকলমে বুঝিয়ে পড়িয়ে মুখস্থ করে দিয়ে গেছেন যে জন্য বেচারাকে তাঁর জীবনটাকে খুইয়ে দিতে হয়েছে।

★আমেরিকার চেহারা

আমরা বাংলাদেশে বসে একরকম আমেরিকা চিনি।

শান্তি আর শান্তি।

ডালার আর ডলার।

স্বাধীনতা আর স্বাধীনতা।

কিন্তু ম্যালকম বললেন আরেক আমেরিকার কথা।

"অডুবনের মঞ্চে" বক্তৃতায় বললেন, এই দেশ পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ এবং এখানে দারিদ্রতা আছে।

এখানকার বাসস্থান খারাপ;বস্তির মতো।শিক্ষা নিম্নমানের। আর এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী দেশ।

কিন্তু আমরা আমেরিকা বিরোধী নই।আমরা আমেরিকার ভুল কাজগুলোর বিরোধী।

যেসব কাজ তারা এখানে, বিশ্বজুড়ে করে যাচ্ছে ১৯৬৪ সালে কঙ্গোতে,দক্ষিণ ভিয়েতনামে সে যা করছে তা অপরাধ। মার্কিন সেনাদের দিয়ে প্রতিদিন যে হত্যা করাচ্ছে, যে খুন করাচ্ছে, কোন অপরাধ ছাড়াই মানুষ মেরে ফেলছে তা অপরাধ।

★উপসংহার

ম্যালকম এক্স মালিক আল শাহবাজের প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা বেড়ে গেছে বহুগুণ। তাঁর সত্য সাহসী কন্ঠের প্রতি লাখো সালাম।

ম্যালকম এক্স একজন মানুষ তাই মতামত, ভিন্নমত চিন্তাধারা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে পরিবর্তন আসা ভিন্ন কিছু নয়।

আমরা দেখতে পাই এলিজা মুহাম্মাদের সাথে সম্পর্কের প্রথম দিককার চেতনা একরকম। মক্কায় যাওয়ার পর আরেক রকম।

তবে জীবনের শেষ দিকে সহিষ্ণু আচরণ, পরিপক্বতার উদাহরণ পাই।

সর্বোপরি আমি তাঁকে একজন বিপ্লবী, চেতনাশীল,দায়িত্ববান নেতা হিসেবে আবিষ্কার করেছি।

একজন মুসলিম তাঁর স্বজাতির প্রতি কতটা দায়বদ্ধ, মানবমুক্তির প্রতীকের আসনে আসীন,জনপ্রিয়তায় আকাশছোঁয়া প্রতিক তা ম্যালকম এক্সকে না জানলে আর জানা হত না।

আল্লাহ পাক তাঁকে ক্ষমা করে জান্নাতের বাসিন্দা বানিয়ে নিন।

★ অনুবাদ ও প্রকাশনী

সাবলীল রুচীশীল পরিচ্ছন্ন অনুবাদ উপহার দেওয়ায় মুহসিন আব্দুল্লাহ সহ সম্পাদক ও গোটা প্রজন্ম টিমকে আন্তরিক মুবারকবাদ। প্রজন্মের বইগুলো আন্তর্জাতিক মানের মনে হয়েছে এবং ভিন্নধারার প্রকাশনার জন্য সত্যি সত্যিই বাহবা পাওয়ার উপযুক্ত।

মুহাম্মাদ আইয়ুব

২৬-১১-২৫

সকাল ০৭ঃ২১ মিনিট

আরও পড়ুন...

0 মন্তব্য রয়েছে

একটি মন্তব্য করুন

চিন্তা করবেন না! আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশ করা হবে না।

জনপ্রিয় ব্লগ

বিভাগ

সর্বশেষ ব্লগ